প্রস্থান

অলংকরণ: আরাফাত করিম

শৈশব থেকেই মায়ের খুবই কাছাকাছি থাকতাম। বড় ভাই থাকায় সুবিধা ছিল মায়ের হাতে খুব একটা মার খেতে হয়নি। আমার আর দাদার ঝগড়া লাগলে সব সময় দাদাকেই মার খেতে দেখেছি। কিন্তু মায়ের রক্তচক্ষু কখনো উপেক্ষা করতে পারিনি। বড় হওয়ার পর মা আর শাসন করেননি।

একটা সময় পরিবারে অভাব লেগেই থাকত। দুঃখের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কখনোই শরীরটাকে শান্তি দিতে পারেননি মা। তবে কখনো আমাদের স্বপ্নকে হারতে দেননি। প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন দুই ভাইয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে। স্নাতক শেষে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে তিন বছর লেগে যায়। তবু মা একবারও বলেননি স্বপ্ন ছেড়ে দিতে। যখন যেমন অর্থের প্রয়োজন হয়েছে, মা সামনে এনে দিয়েছেন। একবারও কৈফিয়ত চাননি ব্যর্থ নাকি সফল হলাম। দুই সন্তান সুস্থ আছি মানে উনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

এবার দেশে যাওয়ার পর মায়ের কত কথা জমে ছিল, বুঝতে পারি। সুখ-দুঃখের সব আলাপ করতেন, আমি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত শুনতাম। মাঝেমধ্যে মনে হয়, যে স্বপ্নের পেছনে ছুটছি, সেই স্বপ্নে মা-বাবা তো পেছনে পড়ে রইল। তাঁদের যে গর্বিত করতেই হবে।

শেষবার দেশ ছেড়ে আসার সময় ঢাকায় হোটেলে উঠেছি। আমি, বাবা আর মা এক রুমে। দুটি খাট, বাবা আমাকে একটি খাট দিতে চাইলেন। কিন্তু মা নাছোড়বান্দা, আমার সঙ্গেই থাকবেন। মায়ের পাশে শুয়ে ওনার সেই চিরচেনা ঘ্রাণ আবার পেলাম। তিনি আমায় জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদছিলেন। আমারও কান্না পাচ্ছিল; কিন্তু মাকে বুঝতে দিইনি।

ফিরে আসার দিন মা-বাবাকে বিদায় দিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিমানে চড়ে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান উড়াল দেবে। মনে পড়ল, মাকে তো রেখে যাচ্ছি। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। মাকে ফোন দিলাম, কান্নার জন্য কথা বলতে পারছেন না। পুরো যাত্রাপথে মনে হচ্ছিল, আমরা আমাদের স্বপ্নের কাছে কত অসহায়! লোকে বলে, যার পাশে মায়ের ছায়া আছে, সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী। সেদিন এই কথা উপলব্ধি করলাম।

পিএইচডি গবেষক, চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া