ঝড়ের ঝাপটায় জানালার কাচ ভাঙার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আকাশ জাঁকিয়ে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ঘ্রাণ নিতে খিড়কির পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, মায়ের বাগানের আমগাছে বেশ কয়েকটি সিঁদুরপরা আম বাতাসে দুলছে। টুপটাপ দু-একটা আম ঝরে পড়ছে টিনের চালে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটার নাচন অনবদ্য। বৃষ্টিস্নাত সকাল সুন্দর হয়। দূর থেকে ভেসে আসছে ডাহুক পাখির ডাক।
বয়স তখন ৯ কি ১০ হবে। টিনের চালা, মাটির ঘর। ছোট ভাই মামুন আর আমি একটা খাটে গাদাগাদি করে কাঁথার নিচে শুয়ে থাকতাম। মা কাঁথা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন, মশারি টাঙিয়ে দিতেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল, বাবার পোস্টিং তখন কক্সবাজারে। বাবা সেদিন ছুটিতে বাড়িতে ছিলেন। তাঁকে দেখলাম ব্যাটারিচালিত রেডিও কানের কাছে নিয়ে কী যেন শুনছেন। রেডিওর ফ্যাস ফ্যাস শব্দ কানে ভেসে আসছে। বাবা বললেন, ঘূর্ণিঝড় হবে, ৭ নম্বর মহাবিপৎসংকেত। সন্ধ্যা হতে বিপৎসংকেত ১০ নম্বরে চলে গেল। ঝোড়ো হাওয়া, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। গোধূলিবেলায় মা হারিকেন জ্বালিয়ে দিলেন। রাত আটটার মধ্যে সবাই রাতের খাবার শেষ করলাম। রাত যত বাড়তে থাকে, বাতাসের তাণ্ডব বাড়তে লাগল। মা আমাদের কাঁথা দিয়ে শুইয়ে দিলেন। বজ্রপাত, বাতাসে গাছপালা ভাঙার শব্দ কানে আসছে। খিড়কি ছোট, একটা ছিদ্র দিয়ে দেখলাম আকাশে যেন বাতাসের সঙ্গে আগুনের শিখার শোঁ শোঁ শব্দ। ভয়ে গা ছমছম করছিল। মামুন ভয়ে কাঁদছে। মাকে জড়িয়ে ধরলাম, দুজনে মায়ের আঁচলে। মা পাখি তার ছানাকে ডানা দিয়ে যেভাবে আগলে রাখে, ঠিক সেভাবে। মা দোয়া পড়ছেন আর আল্লাহকে ডাকছেন।
রাতভর মা তাঁর দুই সন্তানকে শাড়ির আঁচলে আগলে রাখলেন। প্রার্থনা করেছিলেন, যাতে সন্তানদের কোনো ক্ষতি না হয়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যেন নতুন পৃথিবী দেখলাম।
আমাদের মায়ের বাগানের মাটির ঘরের চারদিকে ছিল আম, কাঁঠাল, জাম, নিম, জামরুল, নারকেলসহ নানা জাতের ঔষধি গাছ। রাতভর মা তাঁর দুই সন্তানকে শাড়ির আঁচলে আগলে রাখলেন। প্রার্থনা করেছিলেন, যাতে সন্তানদের কোনো ক্ষতি না হয়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যেন নতুন পৃথিবী দেখলাম। আশপাশের বাড়িঘর সব লন্ডভন্ড। আমাদের টিনের চালে একটা গাছও পড়েনি; অলৌকিকভাবে রক্ষা পেল বাড়ি। গাছগুলো ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। মায়ের দোয়ায় মহান সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে দিলেন সবাইকে। মাটির চুল্লিতে পানি, ঘরের মেঝেতে পানি, উঠান পানিতে টইটম্বুর। মা আমাদের মুড়ি-বিস্কুট, চানাচুর খেতে দিলেন। শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে মা কাঁদছেন। কী খাওয়াবেন সন্তানদের। কেমন করে রান্না করবেন। চারদিকে মানুষ ছোটাছুটি করছে। অনেকের বাড়িঘর, গাছপালা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দুপুরের দিকে নানাবাড়ি থেকে টিফিন আর গামছা মোড়ানো মোছা ভাত পাঠিয়ে দিলেন নানুমণি। তিনিও তাঁর মেয়ের কথা ভেবে নিশ্চয় অস্থির ছিলেন। দোয়া করেছেন মেয়ের জন্য। মা খুব খুশি হলেন। নিজে না খেয়ে সন্তানদের আগে খাওয়ালেন। রাতের জন্য অল্প খাবার রেখে দিলেন। কী বিষাদের স্মৃতি। সবকিছু স্মৃতির ঝাঁপিতে বন্দী।
কত বছর পেরিয়ে গেল। নিজেও বাবা হয়েছি। এখন বুঝি, সন্তানদের জন্য মা-বাবা কত কষ্ট করেন। মা এখন বার্ধক্যে হুইলচেয়ারে। বিছানা এখন তাঁর সঙ্গী। ইশারায় কথা বলেন। হুইলচেয়ারে বসে প্রথম আলো পত্রিকা পড়েন। আমার লেখা ছাপা হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন, মাঝেমধ্যে মনের আনন্দে শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন।
কয়েক মাস আগে বাড়িতে গিয়ে শুনলাম, মা তাঁর বউমা, নাতি-নাতনি, বাবা—সবাইকে খামে করে টাকা বিতরণ করেছেন। মা তো চাকরি করেন না, এত টাকা কোথায় পেলেন? পরে জানলাম, বাপের বাড়ির জায়গা সরকার বরাদ্দ নিয়েছে। সেখান থেকে মায়ের নামে টাকা এসেছে। মা সব টাকা সবাইকে বিতরণ করলেন। আমার ভাগের টুকু যত্ন করে শাড়ির আঁচলে গিঁটে বেঁধে রেখেছিলেন। কাউকে দেননি। বাড়ি যাওয়ার পর কাছে ডাকলেন ইশারায়, ‘নে এটা তোর ভাগেরটা।’ টাকাগুলো নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলাম, ভালোবাসা মাখা মায়ের হাতের স্পর্শ, শাড়ির আঁচলের সুঘ্রাণ লেগে আছে। চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ল মনের অজান্তে। পৃথিবীর সব মা-ই বুঝি এমন হন।
বাড়ি থেকে এলে মা সব সময় চিন্তা করেন, মেসে কী খাচ্ছি না খাচ্ছি। পৃথিবীর একমাত্র অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহের ব্যাংক হিসাব মা। যে হিসাবে কখনো ভালোবাসা ও স্নেহের ব্যালান্স শূন্য হয় না। বর্তমানে আমার মা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। নাকে রাইসটিউ দিয়ে খাবার দিতে হয়। সেদিন বাড়ি গিয়ে মায়ের শিয়রে দাঁড়ালাম। চোখের কোণে জল দেখে বিছানায় থেকে মা আমাকে তাঁর শাড়ি আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে দিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিড়বিড় করে কী জানি বলছেন, বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো বলছেন, ‘আমি এত তাড়াতাড়ি অসুস্থ হলাম কেন? আমি তো নিজ হাতে তোদের রান্না করে খাওয়াতে পারছি না, এ জন্য খুব কষ্ট।’ ঢাকায় আসার সময় মা দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দেন। ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন না, ইশারায় হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেন, দোয়া করেন। বাড়ি থেকে আসার সময় মা শাড়ির আঁচলে মাথা লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদেন।
মা জননী! আপনি আছেন বলে আমার জান্নাত আছে, পৃথিবী আছে। আপনার শাড়ির আঁচল আমার বেঁচে থাকার ছায়া। মা, আমি তো আপনার অলিন্দে ফোটা নীল পদ্ম-শাপলা। আপনার পদ্ম শাখায় আজও আগলে রেখেছেন আমাকে। আপনার দোয়ার বৃষ্টি প্রতিনিয়ত বর্ষিত হয় আমার ওপর। মা! আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। এই যান্ত্রিক নগরে এসে হাড়ে হাড়ে টের পাই, মায়ের আঁচল সন্তানদের অকৃত্রিম ভালোবাসার শেষ আশ্রয়স্থল।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা