আমাদের বাড়িতে একটা বিড়াল আছে। গায়ের রং সাদার ওপর হালকা ধূসর বর্ণের। মুখে হালকা গোঁফ। দেখতে ভারি সুন্দর। বাড়ির সবাই ওকে রানি বলে ডাকে। নাদুসনুদুস এবং একটু মোটাতাজা। চোখের রং কালো। পুরো বাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়। রানি সবার চোখের মণি। খুব প্রভুভক্ত। বাড়ির সবার ডাকে সাড়া দেয়। বসে থাকতে বললে বসে থাকে, শুয়ে থাকতে বললে শুয়ে থাকে। আর সারাক্ষণ খেলে বেড়ায়। বল নিয়ে খেলে। লাটিম নিয়ে পা দিয়ে ঘোরানোর চেষ্টা করে। ইঁদুর ধরে না মেরে ওর সঙ্গে মজা করে। এভাবেই কেটে যায় রানির দিনগুলো।
রানি ভীষণ সৎ প্রকৃতির। ওর সামনে হাজারো লোভনীয় খাবার পড়ে থাকলেও খায় না। আমাদের খাওয়ার সময়ই কেবল সে খায়। মানে আমাদের মতো তিনবেলা খায়। আর অবসরে খাটে গিয়ে ঘুমায়। ঘুমানোর সময় আমার গিন্নি মনোয়ারা রহমান ফ্যান ছেড়ে দেয়। ফ্যানের বাতাসে রানির লোমগুলো দুলতে থাকে। কী দারুণই না লাগে দেখতে! রানি ভাত, মাছ, দুধ, মাংস সবই খায়। তবে মাছ বেশি প্রিয় তার।
পরিবারে আমরা চারজন। বড় ছেলে বাঁধন নৌবাহিনীতে চাকরি করে, খুলনায় থাকে। আর আমরা তিনজন বাড়িতে থাকি। আমি, গিন্নি আর ছোট ছেলে বাপ্পি। সবাই দুধ পছন্দ করি। রানি দুধ অতটা পছন্দ করে বলে মনে হয় না। দুধ খুবই কম খায়। বাড়িতে গোয়ালা প্রতিদিন এক কেজি দুধ দিয়ে যায়। আমরা সবাই মিলে খাই।
ইদানীং দেখা যায়, দুধ জ্বাল দিয়ে ঘরে রেখে দিলে কিছুক্ষণ পর এর পরিমাণ অর্ধেক বা তারও কম হয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার সময় গিন্নি সবাইকে কম করে দিচ্ছে। বেশ কয়েক দিন ধরেই এমন হচ্ছে। একদিন হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুধ কি কম করে রাখছ? এত অল্প পরিমাণ দাও যে!’
গিন্নি বলল, ‘না তো, কম রাখব কেন? আমি তো ভাবলাম, তোমরা আগে খেয়ে নাও।’
বাপ্পি বলল, ‘আমি খাই না।’
আমি বললাম, ‘আমিও খাই না।’
গিন্নী এবার বলল, ‘আমি কেন গোপনে খাব?’
তাহলে দুধ যায় কোথায়? রানি তো বেশি দুধ খায় না! এভাবে আরও কিছুদিন গেল। পরিস্থিতি আগের মতোই। বাপ্পি চুরি করে খায় কি না, দেখার জন্য একদিন সে স্কুলে গেলে দুধ জ্বালিয়ে রেখে দেওয়া হলো। স্কুল থেকে ফেরার আগেই গিন্নি গিয়ে দেখল যে দুধ অর্ধেক হয়ে গেছে। এখন আমাকেও দোষারোপ করতে পারবে না। কারণ, আমি আর বাপ্পি একসঙ্গেই স্কুলে যাওয়া-আসা করি। তাহলে এই দুধ কে খাচ্ছে?
বাড়িতে মাঝেমধ্যে ভাতিজা কাঁকন আসে। কিন্তু সে তো না বলে দুধ খাওয়ার মতো ছেলে নয়। গিন্নি পড়ল মহাবিপদে! রানি দুপুরের সময় দিব্যি ঘুমায়। রাতে সবাইকে নিয়ে বৈঠক ডাকা হলো। কে দুধ খায়? চোরকে কীভাবে ধরা যায়?
কাঁকন বলল, বড়মা একটা বুদ্ধি দিতে পারি?
—দাও।
—ঘরের এককোণে লুকিয়ে বসে নজর রাখা যেতে পারে।
—তুমি থাকবে?
—না, খুব কষ্টের কাজ।
বাপ্পি বলল, ‘বিষয়টা আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমিই দুধচোরকে ধরব।’
গিন্নী জিজ্ঞেস কলল, কাউকে বলা যাবে না?
—না, বলা যাবে না!
কিন্তু এত কিছুর পরও চোর ধরা যাচ্ছে না। এবার বাপ্পি একটা বুদ্ধি বের করল। মুঠোফোনের ভিডিও ক্যামেরা অন রেখে সেটি দুধের পাতিলের পাশে রেখে দিল সে। ঘণ্টাখানেক পর বাপ্পির চিৎকার, ‘আব্বু, আম্মু, কাঁকন, এদিকে এসো। দুধচোর ধরা পড়েছে।’ আমরা সবাই দৌড়ে এলাম। দেখে তো রীতিমতো হতবাক!
রানি পাশের রুম থেকে ধীরে ধীরে এদিক–ওদিক তাকিয়ে দুধের কাছে গিয়ে মুখ দিয়ে ঢাকনা আস্তে করে সরিয়ে পেট ভরে দুধ খেয়ে আবার ঢাকনার মুখে ঠেলা দিয়ে যথাস্থানে রেখে খাটের ওপর গিয়ে শুয়ে পড়ল!
মধুখালী, ফরিদপুর