পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে আমি আর দিদি সব সময়ই মা–বাবাকে প্রণাম করি। দিদি বাবাকে আগে করত। আর আমি মাকে আগে প্রণাম করতাম। আমার কাছে, ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম; কিন্তু মা স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’
প্রিয় মা, তুমি যেভাবে আমার জন্য প্রার্থনা করতে, এখন আমি তোমার জন্য করি—তোমার আত্মার শান্তির জন্য, মুক্তির জন্য। তুমি মাঝেমধ্যে বলতে, ‘আমি যদি মারা যাই, তবে তুই কী করবি?’ আমি বলতাম, ‘তোমাকে আমি বাঁচিয়ে আনব মহাস্থানগড়ের জিয়ৎ কুন্ডের পানি খাইয়ে।’ কিন্তু তোমায় আমি বাঁচাতে পারলাম না।
দিদি আমার থেকে আড়াই বছরের বড়, প্রায় সমবয়সী। কিন্তু তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। মা, তোমার সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব ছিল। ছোটবেলায় সারা দিন বাসায় মন খারাপ করে বসে থাকতাম। বিকেল চারটায় তুমি যখন স্কুল থেকে আসতে, আমার আনন্দের সীমা থাকত না। তোমার পেছন পেছন ঘুরতাম, সব কথা শেয়ার করতাম। এখন অনেক কথাই জমে থাকে, কারও সঙ্গে শেয়ার করা আর হয়ে ওঠে না।
মা, তোমার মনে আছে, সপ্তম শ্রেণিতে গণিতে ৪৯ পেয়েছিলাম। বাসায় এসে কান্না করে দিই। কম নম্বর পাওয়ায় বাবা অনেক বকা দিয়েছিল; কিন্তু তুমি আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। আমার জন্য নতুন ব্যাগ, পেনসিল বক্স কিনে দিয়েছিলে। পরের দিন এসব নিয়ে স্কুলে যাই। সহপাঠীরা অবাক হয়েছিল, কম নম্বর পেয়েও নতুন জিনিস কিনে দিয়েছিলে বলে। জেএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমার জন্য নতুন ডায়েরি, ‘কাকাবাবু সমগ্র’ বই কিনে দিয়েছিলে। আমার লেখা গল্প যেদিন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, বাবা খুব অবাক হয়েছিলেন। আর তুমি খুব খুশি হয়েছিলে। মা, এখন আমার ব্যর্থতায় সান্ত্বনা বা সফলতায় আনন্দ প্রকাশ করার মতো কেউ নেই।
স্কুলে আমার সঙ্গে কেউ ঝগড়া করতে এলে তুমি তাদের কানমলা দিতে, তাদের বাবা-মায়ের কাছে বিচার দিতে। মা, তোমার জন্য আমার অনেক শত্রুই বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। এখন স্কুল শেষ করে কলেজও পাস করলাম। অনার্সে ভর্তি হয়েছি। তোমাকে প্রতিনিয়ত মিস করি, মা।