ভালোবাসার চিঠির আবেগ এবং উষ্ণতা নিয়ে ‘ইতি চিত্রা’

ইতি চিত্রা সিনেমায় ইভান ও জান্নাতুল রিতু। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে

দুই কলেজ পড়ুয়ার প্রেম। চিঠি চালাচালি। চিঠি নিয়ে সুন্দর একটি গান ‘হাওয়ার গাড়ি তোমার লাইগা চিঠি লইয়া যায়...’। গানের অতি সুন্দর অন্তরঙ্গ চিত্রায়ণ, মন কেমনের দেশে নিয়ে যায়।

তখন মোবাইল, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপের যুগ আসেনি। শহর থেকে গ্রামে জরুরি ফোন এলেও পোস্ট অফিসে আসে। টেলিফোন সহজলভ্য নয়। জরুরি ভিত্তিতে টেলিগ্রাম আসে। আর ডাকপিয়ন এসে চিঠি দিয়ে যায়। ডাকপিয়ন মানে, সেও তো অন্য এক আবেগ–অনুভূতির মেঘদূত। ঝোলায় ভর্তি করে শুধু গোটা দুনিয়ার চিঠি নিয়ে আসে না। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবার সুখ–দুঃখের খবর নিয়ে যায়। গ্রামের সহজ–সরল মানুষেরা ধর্ম–জাতি–নির্বিশেষে একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। আশি–নব্বইয়ের দশকের সেই সময়কার চিঠির আবেগ এবং উষ্ণতা ছড়ানো সুন্দর একটি মিষ্টি গল্প চলচ্চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক রাইসুল ইসলাম অনীক। নামটিও বড় সুন্দর—‘ইতি চিত্রা’।

ইতি–তে যে থাকে, সেই তো শব্দে–ছন্দে–বর্ণে–গন্ধে প্রাণঢালা আবেগ–অনুভূতিতে একান্ত ব্যক্তিগত চিত্রকল্প এঁকে যায়। খাম খুলে চিঠির ভাঁজে তাই শ্বাসপ্রশ্বাস অনুভূত হয়। শব্দের বাগানে ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। তরুণ পরিচালকের প্রথম চলচ্চিত্র তেমনই এক শিরায় শিরায় বহমান স্রোত। শৈল্পিক কারিগরি দক্ষতায় নান্দনিক সৌন্দর্যে একেবারে অনবদ্য।

ভালোবাসা সাধনার বিষয়। প্রেম বা ভালোবাসার গল্পকে আপন সৃষ্টি চেতনায় দাঁড় করাতে গেলেও সাধনার প্রয়োজন। গভীর সাধনা ছাড়া প্রেমের পুষ্প পরিস্ফুটিত হয় না। পরিচালক অনীক দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়ে চলচ্চিত্রের নিপুণ সাধক, তা তাঁর কাজ দেখেই বোঝা যায়। আবেগ মথিত এই প্রেমের গল্প তাই সবার হৃদয় স্পর্শ করে।

চলচ্চিত্র পরিচালকেরা সাধারণত যে ঝুঁকি নিতে চান না, নতুন মুখ তুলে এনে অভিনয়ের সুযোগ করে দেওয়া। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ মানে অনেক অর্থ ব্যয় করে একধরনের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সে ক্ষেত্রে বাজার থেকে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে আনার চিন্তা থাকে। নামী তারকাখচিত চলচ্চিত্র হলে ঝুঁকি কিছুটা কমে। কিন্তু এ বিষয়টিও মাথায় রাখার আছে, আজকে যিনি তারকা, একসময় তিনিও নবীন মুখ ছিলেন। কোনো একজন পরিচালক ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে সুযোগ দিয়েছিলেন বলেই তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছেন। আবার শক্তিমান পরিচালকের স্বাধীন সত্তা বালুচরে অবহেলিত ঝিনুকের ভেতর থেকেও মুক্তা খুঁজে আনতে পারেন। পরিচালক অনীক প্রথম চলচ্চিত্রেই তুলে এনেছেন একেবারে আনকোরা নতুন দুজন নায়ক–নায়িকা। আবার তুলে এনেছেন মানে হলো, এই দুজনের মধ্যে যে শক্তিমান শিল্পী সত্তা আছে, তা আবিষ্কার করেছেন। এই দুজন দক্ষ তরুণ অভিনেতা জহুরী অনীকের প্রত্যাশা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করতে পেরেছেন।

চিত্রা নাম ভূমিকায় জান্নাতুল রিতু একেবারে যেমন তুলার মতো নরম ফুরফুরে, আবার অন্তরে বজ্রমানিক যথেষ্ট প্রতিভাময়ী। পরিচালকেরা ঠিকমতো চরিত্রে সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে অনেক দূর যাবেন। মাশুক চরিত্রে রাকিব হোসেন ইভান যেন অভিনয় করেননি, নিজের জীবনের একটা পরিস্থিতির মধ্যে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। গল্পটা যেন তাঁরই গল্প। এই তরুণ জুটি তাই গল্পের চরিত্র নয়, নিপুণ আত্তীকরণে বাস্তবের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছেন বলেই চলচ্চিত্রটি এতটা সুন্দর হয়ে উঠতে পেরেছে।

গল্পের মধ্যে বেশকিছু সুন্দর বার্তা আছে। মাস্টারের মেয়ের সঙ্গে মুচির ছেলের প্রেম। সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে যুগে যুগে মানবিক প্রেম, এভাবেই তো বাধা–বিপত্তি অতিক্রম করে বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। মুচি হলেও তিনি মায়াযুক্ত সংবেদনশীল মানুষ, অন্য দশজন পিতার মতো সন্তানের জন্য অনেক কিছু করতে পারেন। মুচির ছেলেও পড়াশোনায় মেধাবী হয়। গ্রামের ছেলে শহরে পড়াশোনার সুযোগ করে নেয়।
প্রেম করার জন্য কারও পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হয় না। প্রেম করে সবাই বখে যায় না—প্রচলিত ধারণার বিপরীতে এটাও একধরনের সুপ্ত বার্তা। প্রকৃত প্রেমিকের মন একদিকে নরম, আবার কঠিন হতে হয়। সময় এবং অপেক্ষা আকুল বিরহ যাতনার মতোই প্রেমের একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা।

চলচ্চিত্রে আরও উঠে এসেছে মানুষের দুঃসময়ে মানুষই পাশে এসে দাঁড়ায়। গ্রাম থেকে শহরে আসা ছেলে যেমন ঠাঁই খুঁজে পায়। প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে মরতে মরতেও যন্ত্রণাজারিত কথা লিখতে লিখতে বড় লেখক হয়ে ওঠে।

গর্ভে প্রেমজ সন্তান নিয়ে অবিবাহিতা প্রেমিকার তথাকথিত জাত–কুল–মান কিছুই থাকে না; সংসার, পরিবার–পরিজন, আপনজনেরা ঠেলে ফেলে দেয়। এ পরিস্থিতিতেও একক মায়ের অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন সংগ্রামে পাশে এসে দাঁড়ায় অন্য কেউ। আমাদের পচাগলা সমাজব্যবস্থাটা এ কারণেই একেবারে ধ্বংস হয়ে যায় না। বিষের মধ্যে যেমন বাঁশির উত্তরণের সুর থাকে, ধ্বংসের মধ্যেও থাকে সৃষ্টির বার্তা। পরিচালক অনীক শেষ পর্যন্ত তাই মিলনের বার্তা দিয়ে যবনিকা টানেন। দুঃখের শেষে সুখের সন্ধান দিতে চান।

চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনা, ক্যামেরার ভাষা, স্থান নির্বাচন চোখ জুড়িয়ে দেয়। আবহ সুর, গান মন ভালো করে দেয়। গভীর অধ্যবসায়ে সংগীত পরিচালনা করেছেন অধ্যয়ন ধাঁড়া। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে তাঁর সুর মিশে গেছে। দ্বিজ ভূষণ চাঁদের ‘তোমায় হৃদ্‌মাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না...’ বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় গানটির পরিবেশ–পরিস্থিতি অনুযায়ী চমৎকার চিত্রায়ণ হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ঈশা পাল। ‘কেন অকারণে’ গানের কথা লিখেছেন পরিচালক নিজে। কণ্ঠ দিয়েছেন সৌভিক কবি। মাহতিম শাকিবের ‘কাছে আয়না রে তুই’ গানটিও ভালো লাগে। চলচ্চিত্রের মান ধরে রাখতে নরেশ ভূঁইয়া, শেখ স্বপ্না, ফরহাদ লিমন, মনিরুজ্জামান মনি, সোহানা শারমিন, লোবা আহমেদ, কামাল খান, তামিম ইকবাল—সবার অভিনয় প্রশংসনীয়। মাশুককে আশ্রয় দেওয়া প্রকাশনী সংস্থার মালিকের মুখে আঞ্চলিক ভাষা ভালো লাগে। চিত্রার আশ্রয়দাতা নারীও চিত্রার মতোই সুন্দরী, দীপ্তিমান। প্রেমিক–প্রেমিকার চুম্বন, অন্তরঙ্গ দৃশ্য ভালো লাগে। গ্রামের প্রকৃতি, বাড়িঘর, হাটবাজার, শহরের দালানকোঠা, ফুটপাত, স্কুল, লাইব্রেরি, ছাপাখানা, হাসপাতাল গল্পের স্রোতে সবই প্রেম–বিরহ–মিলন যাপনের একেকটা অংশ হয়ে উঠেছে। ‘ইতি চিত্রা’ শেষ হয়েও শেষ হয় না। কারণ, পরিচালক অনীক বুঝিয়ে দেন, সবে শুরু, চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অনেক কিছু দেওয়ার আছে।