সন্ধ্যায় মেঘগুলো একত্রে জড়ো হয়ে এসেছে, শহরের আলোগুলোও বেশ তাড়াতাড়ি জ্বলে উঠেছে। স্নিগ্ধ শীতল বাতাসের সঙ্গে হালকা বৃষ্টি, টিপটিপ শব্দে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। নীলক্ষেত পার হয়ে রিকশা তখন পলাশী রোডে, আর আমার দৃষ্টি নীরবতার ঘোলাটে চাদরে মোড়ানো পলাশী মোড়ের পিচঢালা রাস্তায় ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়া বৃষ্টির পানিতে। হাতের স্পর্শে আসা বৃষ্টির ফোঁটা ছোঁয়ার অনুভূতি।
হঠাৎ রিকশাওয়ালা বললেন, ‘এই কলোনিতে কত দিন ধইরা থাহেন? আমি দশ বছর ধরে এহানেই রিকশা চালাই, আপনারে তো আগে কখনো দেখি নাই!’
‘খুব বেশি দিন হয়নি এখানে আসার। কালকেই তো আপনার রিকশায় করে নীলক্ষেত গিয়েছিলাম।’
আমি খুব আবাক হয়ে বলি, ‘দশ বছর ধরে রিকশা চালান? অনেক সময়! থাকেন কোথায়?’
‘কলোনির পাশেই থাকি। এক মহাজনের রিকশা আমি দশ বছর ধরে ঢাকা শহরে চালাইতাছি।’
‘ও আচ্ছা, পরিবারসহ থাকেন বুঝি! নাকি একা? আপনার দেশের বাড়ি কই?’
‘একাই থাহি মা, দেশের বাড়ি সাতক্ষীরা।’
নীরবতার ঘোলাটে চাদরে আমি এতটাই আবদ্ধ ছিলাম যে খুব একটা কথা বলার ইচ্ছা করছে না। তাই প্রশ্নের সংখ্যা আর বাড়াইনি। কিছু সময় চুপ থেকে রিকশাওয়ালা ভাইটি নিজেই আবার বলা শুরু করলেন—
‘আমার দুইডা ছেলে মা। তারা সবাই দেশেয় থাহে। আর আমি ঢাকায় একাই থাহি।’
আমি একটু মুচকি হেসে বলেছিলাম, খুবই সুন্দর আপনার পরিবার। তিনি আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমার ছেলে ক্রিকেট খেলা শেখে মা। খুবই ভালো খেলে। ছেলেটার জন্যই ঢাকা শহরে পইড়া আছি। দশ বছর ধইরা রিকশা চালাই। আট বছর ধইরা ছেলেটা আমার খেলা শিখতাছে। মাসটা গেলেই খাইয়া না–খাইয়া আমারে তার লেখাপড়ার খরচ বাদে দশ হাজার টাকা পাঠান লাগে। আমার জীবনে মা শুধুই একটাই স্বপ্ন, আমার ছেলে একদিন জাতীয় টিমে খেলব।
নীরবতা ভেঙে একরাশ আনন্দ ক্রমে আমাকে গ্রাস করছে। রিকশার সিটে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম কথাগুলো।
‘কোন ক্লাসে পড়ে আপনার ছেলে?’
‘ক্লাস টেনে। আমার ছেলেরে দেখলে মনে হইব না যে সে আমার ছেলে। লেখাপড়া আর খেলা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। এহন সে ইনকাম করবার পারে। ওরে বিভিন্ন জেলার টিমের খেলায় ভাড়া করে খেলাতে নিয়ে যায়।’ (এ সময় রিকশাওয়ালা ভাইটির চোখেমুখে গর্বের হাসি ছিল)
‘আপনার ছেলে একদিন অনেক ভালো নাম করবে। আপনার সব ইচ্ছা পূরণ হোক, দোয়া করি।’
‘আমরা গরিব মানুষ মা। টাকা না থাকলে কিচ্ছু হয় না। কী হইব জানি না! গরিব মানুষের শখ থাকতে নেই।’
একসময় রিকশাটা আমার গন্তব্যে এসে থেমে যায়। বিদায়বেলায় ভাড়া দেওয়ার সময় কেবল বললাম, একদিন আপনার ছেলে জাতীয় টিমে খেলবে। সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ