একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে খান আতার ছবি দেখতে বসি। হৃদয়ে খঞ্জনি বাজে।
একটি ভালো চলচ্চিত্র উপভোগ করতে হলে দর্শককেও তৈরি হয়ে বসতে হয়। বাংলাদেশের পুরোনো দিনের চলচ্চিত্র মানেই একটি সোনার খনি। খান আতাউর রহমানের মতো প্রথিতযশা চলচ্চিত্র–গবেষকের চলচ্চিত্র মানেই গল্প, গানে, সংলাপে, অনবদ্য চিত্রনাট্য। যেন চোখের সামনে দিয়ে জীবনের জলতরঙ্গ ভেসে যাওয়া, একরাশ মুগ্ধতায় একটা ‘মন কেমনের’ দেশে হারিয়ে যাওয়া।
‘দিন যায় কথা থাকে’ চলচ্চিত্রটি সাদাকালো চলচ্চিত্র নির্মাণের সময়ের ইতিহাস। ১৯৭৯ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটি শুরুই হয় এক শহুরে ব্যবসায়ী সন্তানের স্ত্রী–কন্যা সহকারে নৌকায় চড়ে মাটির টানে গ্রামের বাড়িতে ফেরার দৃশ্য নিয়ে। সেই নদীতে নিজের ছোট্ট ডিঙিতে ভেসে দেওয়ান আবদুল আযীযের লেখা ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে/ আমি আর বাইতে পারলাম না…’ মরমিয়া ভাটিয়ালি গানটি গেয়ে চলেছে গ্রামের ছোট্ট কিশোর। এই করুণ ব্যথার জীবনজুড়ানো গানের কথা এবং সুর বাংলাদেশের অন্তরাত্মার সুর। এই সুর আবহমানকালের। পদ্মা নদীর মাঝি লেখার সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনের মধ্যেও তা–ই ভাসতে থাকে।
গ্রামের মানুষ আর প্রকৃতিকে একসুরে মিলিয়ে অনবদ্য চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক প্রমোদকার। প্রমোদকার একটি ছদ্মনাম। সেই ছদ্মনামের আড়ালে বড় সত্তাটিই যে হলেন খান আতাউর রহমান। এ জায়গাটিও বেশ মজার। যিনি চিত্রনাট্য, সংলাপ, সুর, সংগীত সব গুছিয়ে তোলেন, পরিচালকসত্তা তার থেকে আবার একটু দূরত্ব বজায় রেখে পরিচালনা বা চিত্রায়িত করে যান। প্রথম ধাপের সত্তার কাছে নির্জনতা একটু বেশি প্রিয়। কারণ, নিভৃতে নির্জনতায় মনে ভেসে ওঠা ছবিকে লিখে যেতে হয়। সুর আর কথার মেলবন্ধন ঘটে আপন সাধনায়; আর পরিচালক সত্তাকে জনতার সামনে এসে জনতার মধ্যে মিশে গিয়ে সরবে মানুষকে দিয়ে মানুষের ছবি তৈরি করে নিতে হয়। জরাসন্ধের লৌহকপাট–এর আখ্যায়িকা অবলম্বনে খান আতাউর রহমান এবং প্রমোদকার দুটি সত্তা মিলে নির্মাণ করেছেন দিন যায় কথা থাকে।
সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘দিন যায় কথা থাকে...’ গানটি এখনো চির সবুজ ও সুন্দর। বাংলাদেশের একাধিক চলচ্চিত্রের কালজয়ী সব গান করেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। গানের কথা এবং সুরের সঙ্গে কণ্ঠ এত সাবলীল বলেই তিনি স্বাভাবিক ভাবেই লক্ষ হৃদয় জয় করতে পেরেছেন।
এই চলচ্চিত্রের সব থেকে সুন্দর মর্মস্পর্শী গান হলো রুমানা খানের কণ্ঠে ‘মায়ের মতো আপন কেহ নাই রে…’। এত সুন্দর করে জীবনের নানা ধাপে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে যে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো।
চলচ্চিত্রের পরীক্ষা–নিরীক্ষাও চমৎকার। শহুরে যে ব্যবসায়ী স্ত্রী–কন্যাসহ শুরুতে গ্রামের বাড়ি ফিরছিলেন, সেখানে কিশোরী কন্যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী লোপা। যে গ্রামীণ কিশোর ডিঙি বাইছিল, সেই চরিত্রের খুদে অভিনেতা শাকিল। দুজনই অসাধারণ অভিনয়ে মন মাতিয়ে দিয়েছে। এক ঘণ্টার বেশি সময় কাহিনির মধ্যে এই দুই শিশুশিল্পী ছিল। দুজনই বড় হয়ে একজন হন অভিনেতা ফারুখ, অন্যজন কবরী। দুজনের বড় হওয়ার মুহূর্তটিকে অবিস্মরণীয় করে পরিচালক মাঝামাঝি অংশে চলচ্চিত্রের নামসহ শিল্পী– কলাকুশলীদের বিস্তারিত পরিচয় টেনে আনেন। যা সাধারণত শুরুতেই দেখানো হয়। ছবির আবহসুর চমৎকার, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া।
কবরী আশির দশকে জন্ম হওয়া আমাদের চোখে শুধু মিষ্টি মেয়ে নন, একজন মহানায়িকা। ব্যক্তিগতভাবে কবরীর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক কিছু মধুর সম্পর্ক আছে। চট্টগ্রামে পাথরঘাটা জাইল্যাপাড়ার যে বাসাতে শৈশবে বেড়ে উঠেছি, সেখানে মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন শিবু কাকা নামের একজন। আমার মাকে বউদি আর বাবাকে দাদা ডাকতেন।
আমার মা, মাসি–পিসিদের সঙ্গে গল্প করতেন, শিবু ‘লাভ’ করে কবরীর বোনকে বিয়ে করেছে। আড়াল থেকে শুনে বেশ আনন্দ পেতাম। তবে শিবু কাকার মতো একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত আমাদের মতো পরিবারের মানুষকে ঠিক মহানায়িকার ছোট বোনের বর হিসেবে মন মেনে নিতে চাইত না। কবরীর বোনের বরেরও দামি গাড়ি, বাড়ি থাকবে—এমনটাই ভাবতাম।
ধীরে ধীরে জানতে পারলাম, আমার বাবার বিয়ে হয়েছে পাথরঘাটার ক্যাথলিক ক্লাবের কাছের যে বাসা থেকে, তার পাশেই থাকত কবরীর পরিবার। কবরীর এই ছোট বোন আমার বাবাকে বিয়ের দিন বরের যাবতীয় সাজগোজ করিয়ে দিয়েছেন।
নতুন বউ হয়ে এসে আমার মা–ও মাঝেমধ্যে কবরীদের বাসায় যেতেন। কবরী তখন ঢাকায় থাকেন। আমার জ্যাঠা ঢাকা-চট্টগ্রাম বাস চালাতেন। কবরী জ্যাঠার হাত দিয়ে ঢাকা থেকে তাঁদের পরিবারের জন্য সংসারের খরচ পাঠাতেন।
কবরীর এই বাস্তব জীবনের কথাগুলো শুনে মহানায়িকার পাশে তাঁকে বেশ নিজেদের মাসি–পিসি ধরনের আপনজন ভাবতাম। চলচ্চিত্রে নানা চরিত্রে অভিনয়েও দেখেছি তেমনই সহজ–সরল ও সাবলীল তিনি।
এই চলচ্চিত্রে কবরীর সঙ্গে ফারুখের রসায়ন বেশ মনে রাখার মতো। তবে দুজনের মধ্যে বড় বেলার প্রণয় পর্ব গল্পের টানে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ঘটনার ঘনঘটায় আলাদা করে তেমন প্রেমের দৃশ্য জমে ওঠেনি। ছোটবেলার হারানো বন্ধুকে, যাকে দুজনই খুঁজে বেড়িয়েছে আজীবন, সেই খুঁজে পাওয়াতেই প্রেম।
ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে তোলা শহুরে কিশোরীর সঙ্গে গ্রাম্য কিশোরের তোলা একটি ছবি এখানে সম্পর্কের শিকড়। বারবার স্মৃতির হাতছানি। ভাবতেও অবাক লাগে—তখনকার সময়ে দাঁড়িয়েও ছবি তুলে এক মিনিটে ছবি দেওয়ার মতো যান্ত্রিক ক্যামেরা ছিল।
দিন যায় কথা থাকে কাহিনির মধ্যে মানুষের জীবনের অবস্থা বদলের একটি বড় অভিঘাত আছে। শহুরে কিশোরী বেড়ে উঠেছে সৎমায়ের কাছে। সচ্ছল পরিবারে ব্যবসায়ী বাবার মৃত্যুর পরে সৎমা প্রকৃতই অসৎ হয়ে ওঠে। কিশোরী কন্যার পড়াশোনা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে ঘরের দাসী–বাঁদি করে তোলে।
আর ব্যবসায়ী বাবা পড়শি গ্রাম্য কিশোরকে শহরে নিয়ে এসেছিল পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করবেন বলে। সৎমা সেই কিশোরকে পড়াশোনা করতে না দিয়ে ঘরের চাকর করে তোলেন। একসময় মিথ্যা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে জেলে পাঠিয়ে দেন। এভাবেই শুরু হয়ে যায় দুটি শৈশবের অন্য ভাবে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার লড়াই।
শাকিল ও লোপা ছাড়া অন্য শিশু চরিত্রের অভিনয়ে ছিলেন রতন, আদিল, মিল্টন ও সোহেল। গ্রাম্য কিশোরের বিধবা জনমদুঃখী মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনোয়ারা। আনোয়ারার মাতৃসত্তাবোধ এতটাই প্রবল যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি কিংবদন্তি শুধু নন, প্রকৃতই দেশের একজন ‘হাজার চুরাশির মা’ হয়ে উঠেছেন। ট্রাক ড্রাইভার ফারুখের সহকারীর চরিত্রে অভিনয় করা হাস্যরসিক টেলি সামাদকে বেশ ভালো লাগে। হাসি–কান্না, আনন্দ–দুঃখ, প্রবল জীবনবোধের অভিঘাতে প্রতিটি চলচ্চিত্রে তিনি এভাবেই অনুভূতিতে দোলা লাগিয়ে ও মাতিয়ে দিয়ে যান।
চলচ্চিত্রের কাহিনিতে কবরীকে ধর্ম বোন পাতিয়েছেন তিনি। রক্তের সম্পর্কের বাইরে এভাবে ধর্ম ভাই বা ধর্ম বোন পাতানো আমাদের বাঙালি জনজীবনে মানব সম্পর্কের প্রকৃতই একটি বড় ধর্ম। আমার এ ধরনের সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম পরিচয় কখনো বড় হয়ে দাঁড়ায় না, তেমন নজির ভূরি ভূরি আছে। চলচ্চিত্রের আঙিনায় পরিচালক জীবনের সেসব সম্পর্কের জলছবি তুলে আনেন। খান আতার ছবির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো সরলতা। জটিল জীবনের ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেও জীবনের এই সরলতাকে সহজ–সরল ভাষায় তুলে ধরার সক্ষমতা। যে কাজটি মোটেও সহজ নয়।
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে খান আতার ছবি দেখতে বসি। ছবির সমাপ্তিতেও তাই হৃদয়ে খঞ্জনি বাজে।