এই জায়গাটায় তার বাবা বসত, বাবার আগে দাদা। বাবা এখানে বসার আগে তাকে স্কুলে দিয়ে এসেই তবে বসত। দিয়ে আসার সময় ময়লা শার্টের অর্ধছেঁড়া পকেটে দুটো টাকা গুঁজে দিয়ে আসত। একটা সময় নিতীশ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়। অথচ তার সঙ্গে কেউ বসতে চাইত না। ভীষণ রাগ হয় বাবার ওপর। কেন পড়াশোনা করাল!

নিতীশ ভালো করেই জানে, তারা বংশপরম্পরায় অন্যের জুতা সেলাই করে আসছে। এখন তার পালা, জুতা সেলাই করেই পরিবারের জন্য অন্ন জোগাড় করে। প্রতিদিন যা টাকা পায় তা দিয়ে আধসের চাল, পোয়াখানেক ডাল কিনে পকেট হাতড়ে আর কিছু পায় না। রাতে শোয়ার সময় বাবার বাতের ব্যথার কাতরতা, মায়ের খুকখুক কাশি তাকে অনেক যন্ত্রণা দেয়!

পরদিন এক ভদ্রলোক জুতা সেলাই করতে এসে জুতাটা পা থেকে পা দিয়ে খুলেই তার সামনে তুলে ধরে। নিতীশ কিছুক্ষণ সেই লোকের দিকে তাকিয়ে সহজ কথায় বলে দিল,

—সাহেব, এই কাজ আমি পারব না। আপনি পাশের কারও কাছ থেকে সেলাই করে নিন।

কথা বলার সময় নিতীশ মাথা নিচু করে রাখে। এভাবে অনেক কাস্টমার ফিরিয়ে দেয়। সে যে কাজ জানে না, তা নয় বরং অন্যদের চেয়ে বেশ ভালো কাজ জানে। কয়েক মাস আগে সে পরান কাকুর জুতা সেলাই করে দেয়। এরপর থেকেই কাকু তাকে দেখলেই বলে, ‘তোর হাতের কাজের কোনো তুলনা নেই রে, খাসা বানিয়েছিস আমার জুতাজোড়া।’

আজ পরান কাকু নিতীশের পাশে এসে বসে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমি অনেকবার দেখেছি, তুই অনেকের জুতা সেলাই না করে ফিরিয়ে দিস, আমি কারণটা ঠিক জানি না। কিন্তু পাশের লোকদের দেখ, তাদের কাছে মানুষের ভিড় কমে না। তোর বাবা যখন বসত, তার অবস্থা ওদের চেয়েও ভালো ছিল। আমার মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে করে, কেন তুই এমন করিস? এমনতো না যে তুই কাজ পারিস না!’

—এটা ভুল কাকু, আমি মনোযোগ দিয়েই জুতা সেলাই করি। আসলে ভুলটা আমার বাবার, আমাকে পড়াশোনা শিখিয়ে কেন মানুষ চেনাল। লাথ মেরে দেওয়া জুতা সেলাই করার জন্য কি কোনো মানুষ আসে কাকা? আসে না। আপনাদের মতো কিছু মানুষ নিজের পা থেকে জুতা খুলে আমাকে যখন বলে সেলাই বা ঠিকঠাক করে দিতে, আমি সমস্ত ধ্যানজ্ঞান দিয়ে কাজটা করি। বাবার সেই ভুলের জন্যই আমার তাচ্ছিল্য সহ্য হয় না কাকা! আমি কাল থেকেই প্রথমে ভেবে নেব, আমার জন্য কাজটি বড়, আমার মানুষ চেনার প্রয়োজন নেই, আমার জুতা সেলাই করাই কাজ, তা-ই করে যাব।

পরান কাকু উঠে যায়। নিতীশ ভাবে, কাল থেকে তো আর কাজের অভাব হবে না। সে শুধু তার কাজটাই করে যাবে। মা-বাবার ওষুধ নিয়ে যেতে পারবে। আজ না হয় আর দিনের মতো ওষুধ ছাড়াই বাড়ি যাক!

সন্ধ্যা হতেই বাড়ি ফিরে গেল। মায়ের সামনে মাথা নিচু করে কয়েকটা খাবার চাইল। মা হাত–মুখে জল দিয়ে আসতে বলে রান্নাঘরে গেলেন।

—তোর বাবার ওষুধের টাকাটাও কি তোর রোজগার হয় না রে বাপ? মন দিয়ে কাজ করছিস তো!

—আর ভেবো না মা, কাল থেকে ওষুধের সমস্যা হবে না। ভগবান আজ রাতটা পার করে দিক, সব ঠিক হয়ে যাবে।

মায়ের একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায় শুধু, এই দীর্ঘশ্বাসে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে নিজের ঘরে গেল আধপেটা খেয়েই। পরদিন কাজ শেষে নিতীশ তার মা-বাবা দুজনের জন্যই ওষুধ কিনে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জানে না, তার বাবার আর ওষুধের প্রয়োজন নেই।

বন্ধু, কুমিল্লা বন্ধুসভা

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন