স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কলিগরা সবাই যে যার বাড়ি চলে গেছে। শুধু মাহাবুব অফিসে বসে খবরের কাগজটায় একবার নজর বুলিয়ে নিচ্ছিল। সারা দিন কাগজ দেখা হয় না। হবেই–বা কী করে? আজকাল কেউ কি নিজের কাজ দায়িত্ব নিয়ে করে? যেদিকটা সে না দেখবে, সেদিকটাই যেন মাছের বাজার!
মাহাবুব স্কুলের হেডমাস্টার। অত্যন্ত শৃঙ্খল মানুষ, অমায়িক ভদ্রলোক। কলিগদের প্রতি তার ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বাৎসল্যপ্রেম অগাধ। স্কুলের বাইরে প্রত্যেকের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করে। সবার পারিবারিক খোঁজখবর নেওয়া যেন প্রাত্যহিক রুটিন।
কিন্তু চেয়ারে বসলেই মাহাবুব অন্য মানুষ। কারও কর্তব্যে অবহেলা সে পছন্দ করে না। প্রেয়ার সেশন থেকে শুরু করে শেষ ক্লাস পর্যন্ত তার নিখুঁত দৃষ্টি। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক ও কর্মচারী—সবাই তাকে যমের মতো ভয় করে।
বিশেষ একটা কারণে আজ মাহাবুবের মন খারাপ। কলেজে পড়ার সময় সহপাঠী অনামিকার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মেয়েটির গায়ের রং শ্যামবর্ণ হলেও বুদ্ধিদীপ্ত ডাগর চোখের আকর্ষণ ছিল দুর্বার। সেটাই অনামিকার প্রতি মাহাবুবের মূল আকর্ষণ। তা ছাড়া পড়াশোনাতেও সে ছিল অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকে জেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিল।
যাহোক, স্নাতক শেষ হওয়ার পর অনামিকার আর পড়াশোনা এগোয়নি। একটা দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু হলে বাধ্য হয়েই তাকে বাবার জায়গায় চাকরিটা নিতে হয়। সে ছিল মা-বাবার বড় সন্তান। একটাই ভাই। ভাইটি তখন স্কুলে পড়ে।
এদিকে কলেজ শেষ করে মাহাবুব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মাস্টার্স কমপ্লিট করে বিএডও করে নেয়। তারপর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের চাকরিটা অনায়াসেই পেয়ে যায়। তবে অনামিকার সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। নিয়মিত একসঙ্গে বেড়াতে যেত। বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু অনামিকা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। কারণ, তার চিন্তা ছিল মা আর ভাইকে নিয়ে। সে বিয়ে করে ফেললে সংসারের দায়িত্ব কে নেবে?
মাহাবুবের মা বিয়ের জন্য ছেলেকে বারবার চাপ দিতে থাকে। সে তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাবার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। বেঁচে থাকতে থাকতে ছেলের একটা সাজানো–গোছানো সংসার দেখে যেতে চান। ছেলের পছন্দের মেয়েকে মেনে নিতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু অনামিকার দিক থেকে কিছুতেই সবুজসংকেত পাওয়া যাচ্ছে না।
এ কারণেই আজ মাহাবুবের মনটা সকাল থেকে বিষণ্ন হয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিল, সন্ধ্যায় একবার অনামিকার সঙ্গে দেখা করে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে আর ভালো লাগছে না। একদিকে মা-বাবার চাপ, অন্যদিকে অনামিকার সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ। মাঝখান থেকে নিজেদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মাহাবুব ধীরে ধীরে অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।