আজ পঞ্চম শ্রেণির একটা ক্লাসও হয়নি। শিক্ষকেরা কী কারণে যেন ভীষণ ব্যস্ত। ছেলেমেয়েরা খুব হইহুল্লোড় করছে। পেছনের বেঞ্চের কয়েকটা ছেলের টিফিন বক্স ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সুজন, রফিক ও মাহাদী। এ নিয়ে হট্টগোল হচ্ছে খুব। তখনো চুপচাপ বসে আছে মাহির। আজ তার একটুকুও ভালো লাগছে না। বাবার কথা মনে পড়ছে। হঠাৎ চোখে পানি চলে আসে। বাঁ হাতে চোখ মুছতে মুছতে বাহিরে চলে আসে সে। চুপচাপ কলতলার বেঞ্চিতে গিয়ে বসে। বারবার তার মনে হতে থাকে, আজকে বোধ হয় বাবাকে খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছে! এরই মধ্যে কলে পানি নিতে আসে তৃতীয় শ্রেণির ফাহাদ। মাহিরকে দেখে চোখ বড় বড় করে বলতে থাকে, ‘মাহির ভাইয়া, আপনি এখানে আর হেড স্যার বেত নিয়ে আপনাদের ক্লাসের দিকে গেল দেখলাম।’ একটু নড়েচড়ে বসে মাহির। মনে মনে একটু খুশিও হয়। পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসরুম লাইব্রেরির পাশেই। ওদের চিল্লাচিল্লিতে বিরক্ত হয়েই বোধ হয় স্যার বেত নিয়ে এসেছে। আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে মাহির। তারপর ক্লাসরুমে ফিরে আসে।
রাতে পড়তে বসে মাহির। কিন্তু পড়ায় মন বসছে না। তাদের ভাঙা ঘরটাতে লাইন দিয়ে রাখলেও এখন অবধি বিদ্যুৎ আসেনি। হারিকেনের আলো একমাত্র ভরসা। হারিকেনের মৃদু আলোয় মায়ের অসুস্থ মুখটা দেখতে বড় কষ্ট হচ্ছে তার। তিন ভাইবোনের মধ্যে মাহির সবার বড়। বয়স ১১ বছর। তার বাবা বাজারে ছোট একটি চায়ের দোকান চালান। অর্থ–সংকটে যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারছে না মায়ের। ছোট ভাইটার জন্মের পর থেকেই মায়ের অসুখ। কী অসুখ সেটা জানে না মাহির। দিনকে দিন অসুস্থতা বাড়ছে। এ অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট হয় মাহিরের। কত রাত সে একা একা কেঁদেছে আর আল্লাহর কাছে মায়ের জন্য দোয়া করেছে তার হিসাব নেই।
মনে মনে মাহির ভাবে, বড় হয়ে অনেক টাকা উপার্জন করে ঢাকায় নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাবে। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন। আগের মতো রাতে ঘুমপাড়ানির গান শোনাবেন। দিনের বেলায় ঘরের কাজগুলো করে ফেলবেন। তখন আর প্রায়ই না খেয়েও থাকতে হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফেলে সে। একটু পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মা এসে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ভালো লাগছে না। চোখে পোকা গিয়েছে।’
গতকাল মাহির তাঁর বাবাকে সাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। তখন বাবা চুপ হয়ে যায়। নিচের দিকে মাথা নামিয়ে শুধু একবার বলেছে, সামনের মাসে একজনের কাছ থেকে কিছু টাকা পাওয়ার কথা। পেলেই কিনে দিব। তারপর গোমড়া মুখে বের হয়ে যায় ঘর থেকে।
বাবার কাছে সে কখনোই কিছু চায়নি। একটা নতুন জামা-প্যান্টও না। স্কুলের সব বন্ধুরা অনুষ্ঠানের সময় বাহারি রঙের নতুন নতুন পোশাক পরে আসে। খুব কষ্ট হয় মাহিরের। তবু বাবাকে সে কিছুই বলে না। খাবার খাওয়ার সময় কিছু কিছু তরকারি তার একদমই খেতে ভালো লাগে না। তবু চুপচাপ খেয়ে নেয়। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, আরেকটু বড় হলেই বাবাকে সাহায্য করবে। ওনার কষ্টগুলোর কথা মনে পড়লে ভীষণ খারাপ লাগে। তাই আজ বারবার মনে হচ্ছে এভাবে বলাটা একদমই ঠিক হয়নি। তা ছাড়া আরেকটা সমস্যা তো আছেই। মা ভীষণ অসুস্থ। এখন সাইকেল না হলেও চলবে! কিন্তু যদি মা মারা যায়? তখন কী হবে। একা একা সে থাকতে পারবে তো?
চট করে মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। একটা ছোট কাগজ নেয়। তারপর সেখানে মাহির লেখে, ‘বাবা, আমাকে সাইকেল কিনে দিতে হবে না। সাইকেল কেনার টাকা ও আমার উপবৃত্তির টাকা মিলিয়ে মাকে বড় হাসপাতালে নিয়ে যাও।’ তারপর চুপিচুপি গিয়ে সেটা বাবার বালিশের নিচে রেখে দেয়।
রাতে ঘুমাতে এসে সেই কাগজ পেয়ে যায় মাহিরের মা। বাবাকে সেটা পড়ে শোনায়। ছেলের এসব কাণ্ড দেখে মাহিরের বাবা সেদিন ভীষণ খুশি হয়। প্রাণভরে তার জন্য দোয়া করে। পরদিনই ছেলেকে উপহার দেন একটি নতুন সাইকেল।