তাদের বিয়ের ১২ বছর পরও এই নিয়মিত দৃশ্য দেখে প্রায়ই ক্ষেপে ওঠে ননদ ও শাশুড়ি।
—আহারে! বেডির দরদ দেহস? খালি কান্দন আর কান্দন। বারোডা বছর ধইর‍্যা এমুন কারবার দেখতাছি, শইল জ্বইল্যা যায়।
তাহেরা আজ একটু বেশিই কেঁদেছে, অনেকটা আদিখ্যেতা, স্বামী তো প্রতি মাসে অন্তত একবার বাড়ি আসে আবার দুই দিন থেকে কাজে চলে যায়। আগে আঁচলচাপা মুখে কাঁদত, কিন্তু আজ একেবারে জড়িয়ে ধরে কান্না। শুধু শমশের আলী অবাক হয়নি।

শমশের আলী সগীরের বাবা। বয়সের ভারে পিঠে কুঁজ পড়লেও লাঠি ছাড়াই দিব্যি চলতে পারে। শমশের মিয়ার ভালোই নাম আছে গ্রামে। কেউ তার বাড়ি না চিনলে শুধু যদি বলে, ‘গালিবাজ শমশেরের ঘর কোনটা?’ ছোট–বড় সবাই আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয়। শমশের মিয়া নরম গলায় বলে,
—ওই! তারে থামবার ক! আমার পোলায় তার বউডারে কামে লইয়া গেলেই তো পারে। কান্ধে লইয়া কাম করব।
তাহেরা দৌড়ে রান্নাঘরের আড়ালে চলে যায়। স্বামীর জন্য এখন আর কাঁদছে না সে। সগীর যদিও মনে করে, তাহেরাকে তার জীবনে পেয়ে খুব সুখী। গর্ব করে নিজের সঙ্গে নিজেই। কিন্তু তাহেরা তাকে ভালোবাসে না। পাশের ঘরের বাদশার সঙ্গে মাসের বাকি সময় কাটায়। তাহেরা অবশ্য কোনোভাবেই নিজেকে দোষী ভাবতে পারে না। ভালোবাসা বোঝার আগে এবং শরীরের নানারকম ছন্দের বিশুদ্ধতা বোঝার আগেই তাহেরার বিয়ে হয়ে যায়। তা ছাড়া সগীর মানুষ ভালো হলেও ভালোবাসা বোঝে না, মন বোঝার তো প্রশ্নই ওঠে না।

তাহেরা জানে, সগীর আর কখনোই ফিরবে না। বলবে না,
—কিগো আমার তাহেরা বানু, কেমুন আছ? আমি আইছি, তোমার কথা আমার কামের সময় কও আর ঘুমের সময় কও—হগগল সময় মনে পড়ে। এমুন কইর‍্যা কান্দো পরতিবার যাইবার সময়, আমার যাইতে মন চায় না।
আচ্ছা, তাহেরা তার ১২ বছরের সংসারের অবসান ঘটিয়ে কেনই–বা বাদশার সঙ্গে পালানোর পথ খুঁজে নিল? নিয়েছে ভালো কথা। তাই বলে সগীরকে মারার তো দরকার নেই। এমনিতেই পালাতে পারে। আবার মুহূর্তেই তাহেরা ভাবে, আর যা-ই হোক, সগীর বাকি জীবন কষ্টে কাটাবে, তাহেরার কথা ভেবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যাবে বাকি জীবন। তাহেরা সগীরের ভালোবাসা যে টের পায় না বা বোঝে না, তা নয়। সগীর বোঝাতে অক্ষম হলেও তাহেরা নয়।

বাদশা মিয়া রাতে তাহেরার ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
—আমার কইলজাটা পুড়তাছে তাহেরা, তুই তর জামাইরে মাইরা আমার লগে যাইবার কথা ভাবছস, আবার কোন বাদশার জইন্য আমারে মারার কথা চিন্তা করবি। তাহেরা, তরে আমি আর বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমার তরে দরকার নাই।
পাশেই ননদ জোহরা সব শুনে শুধু দুফোঁটা জল ফেলে আর ভাবে, সব চোখের জলে মমতা থাকে না, সব ফোঁপানো কান্নায়ও না। এ কথা সে কাকে বলবে? আদৌ কি বলা সম্ভব? এসব কথা কস্মিনকালেও বলা সম্ভব নয়।
বাইরে প্রচণ্ড শোরগোল, সগীর নাকি গাড়িচাপা পড়েছে। জোহরা কিছুক্ষণ নিজেকে পাথরের মূর্তিতে আবিষ্কার করে। হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে বলে,
—বাঁইচ্যা গেছে আমার ভাইজান, আমার ভাইজান এত দিন মরা আছিল। আইজ ভাইজান বাঁইচ্যা গেছে।
পাশের ঘর থেকে তাহেরার কান্নার কোনো শব্দ নেই।

বন্ধু, কুমিল্লা বন্ধুসভা

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন