নিজের টাকা দিয়েই বাজার করছেন মখলেস সাহেব। তবু তার চোখেমুখে একটা চোর চোর ভাব ফুটে আছে। ছোট মাছ, লাউ আর কচু কিনেছেন। অনেকক্ষণ থেকে শুঁটকির দিকে তাকিয়ে আছেন। কিনবেন কি না, বুঝতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত কিনেই ফেললেন আধা কেজি শুঁটকি।
চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর একমাত্র ছেলের কাছেই থাকেন। প্রতিষ্ঠিত ছেলে, ছেলের বউ আর এক নাতির ছোট্ট সংসারে কোনো অভাব নেই। নাতিটা বড়ই দাদা নেওটা। দাদার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে যতটা পারে। কিন্তু থাকার সময়ই-বা কই বেশি? স্কুল, কোচিং, ড্রয়িং স্কুল, কারাতে ক্লাস করে এসে দাদুর পাশে বসে কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে যায়। তার মা সবকিছুই করে ঘড়ি ধরে। দাদুর জন্য বরাদ্দ সময় তাই খুবই অল্প।
সারা দিন কিছুই করার থাকে না মখলেস সাহেবের। নিজের মতো করে ঘুম থেকে উঠে কখনো হাঁটতে বের হন, কোনো দিন ছাদে উঠে বসে থাকেন, কখনো খবরের কাগজ আর টেলিভিশন দেখে বিরক্ত হলে কোনো একটা গল্পের বই নিয়ে পড়তে বসেন। বেশিক্ষণ পড়তে পারেন না এখন। মাথা ধরে যায়। একা একাই দুপুর আর রাতের খাবার খান। খেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু উপায় নেই। ওষুধ খেতে হয়। এই বয়সে বয়সের চেয়ে বেশি কারও ওপর বোঝা হতে চান না মখলেস সাহেব।
ছেলের সঙ্গে হয়তো সপ্তাহে দু–একবার দেখা হয়। খোকা অনেক ব্যস্ত। অবশ্য বউমা দিনে একবার হলেও শ্বশুরের খোঁজ নেয়। বড় ভালো মেয়ে। শুধু তার কথার বাইরে বাসায় কিছুই হতে পারবে না। পর্দার রং থেকে রান্নার মেনু—সবকিছুতেই বউমার কথাই শেষ কথা।
গত সপ্তাহে মখলেস সাহেবের কচুর লতি খেতে ইচ্ছা করেছিল খুব। বউমাকে বলায় এমন করে না বলল যে মখলেস সাহেবের লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করেছিল। চোখে পানি চলে এসেছিল। বয়স হলে এই এক সমস্যা। অল্পতেই চোখে পানি চলে আসে। ভাগ্যিস পত্রিকাটা হাতে ছিল। পত্রিকার পেছনে মাথাটা লুকিয়ে ফেলেছিলেন। বউমা দেখতে পায়নি। শুধু তাদের বাসার সাহায্যকারী মেয়েটা, সুফিয়া, অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
বাজারের ব্যাগ নিয়ে মখলেস সাহেব হাঁটতে থাকেন—বাসার দিকে না, উল্টো দিকে। বড় রাস্তা পার হয়ে ছোট রাস্তা দিয়ে হেঁটে রিকশাস্ট্যান্ডটাকে ডান দিকে রেখে বস্তির মাঝ দিয়ে শেষ মাথায় ভাঙা ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটা টিনের দরজা কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দরজাতেই কয়েকবার শব্দ করার পর একটা বাচ্চা উঁকি দেয়। বাচ্চার পেছনেই বাচ্চার মা।
‘খালু আপনে?’ অবাক হয়ে সুফিয়া বলে ওঠে।
‘ভালো আছিস মা। একটা কাজে আসলাম তোর কাছে।’
অবাক গলাতেই সুফিয়া বলে, ‘আগে ভেতরে আইসা বহেন। কী কপাল আমার, আপনি আইসেন।’
মখলেস সাহেব ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে বাজারের ব্যাগটা সুফিয়াকে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাকে এগুলো রান্না করে খাওয়াতে পারবি? তোদের সঙ্গে বসে ভাত খাব! পারবি?’
সুফিয়া কী বুঝল, কে জানে। কিছু না বলে ব্যাগ নিয়ে সরে যায় সামনে থেকে।
এই বয়সে আবেগটা বেড়ে যায়। বেড়ে যায় অভিমানও। অল্পতেই অভিমানী হয়ে ওঠে মন। খাবারের চেয়ে খাওয়ানোর মানুষটাকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে হয়। খাবারে পেট ভরে না। খাবারের সঙ্গে খাবার তুলে দেওয়া মানুষটার মায়ায় পেট ভরে।
সহসভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ