কম্পিউটারের বায়বীয় তুলি তার হাতের তুলিকে কেড়ে নিলে তিনি বেকার হয়ে গেলেন। আমরা তাকে বলেছিলাম ফটোশপ, গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখতে। তিনি আগ্রহ দেখাননি। বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল চালানোর চেষ্টাও করেছিলেন। জমেনি।

শাহিন ভাই চলে গেলেন।
আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘আমার কী মনে হয় রবি জানিস? আমি একদিন ধুম করে চলে যাব। তোরা আমাকে খুঁজেও পাবি না।’ এ কথা বলে অকারণে হো হো করে হাসতেন। এ রসিকতার মানে বুঝতাম না। তবে এই রসিকতা তিনি প্রায়ই করতেন।

শাহিন ভাই নিজে কবিতার লোক হলেও গদ্যের জন্য আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। বলতেন, ‘এই শহরে যে কয়েকজন গদ্য লেখে, তার মধ্যে তুই ফার্স্টক্লাস।’ তার এই কথায় আমার বিশেষ কোনো অনুভূতি হতো না; না গৌরবের, না পুলকের। তবে যে অনুভূতিটা হতো, তা হলো কৃতজ্ঞতাবোধের। বুঝতে পারতাম, শাহিন ভাই আমাকে আসলেই ভালোবাসেন। নিখাদ ভালোবাসা যাকে বলে। ভালোবাসার কারণেই তার এই সমোহ পক্ষপাত।

শুনেছি, কলেজজীবনের বান্ধবী লায়লা নাজনীনকে তিনি ভালোবাসতেন। নাজনীন আপুও। কিন্তু সম্পর্কটা এগোয়নি। শাহিন ভাই ছিলেন ভীষণ সংসার-উদাসী মানুষ। নাজনীন আপু অনেকবার তাকে তাড়া দিয়েছেন, একটা চাকরির সন্ধান করতে। তিনি করেননি। ‘চিত্রকলা’ নামের একটি দোকানে পাথরে খোদাই করতেন, বিভিন্ন পোস্টার ডিজাইন করতেন।

কম্পিউটারের বায়বীয় তুলি তার হাতের তুলিকে কেড়ে নিলে তিনি বেকার হয়ে গেলেন। আমরা তাকে বলেছিলাম ফটোশপ, গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখতে। তিনি আগ্রহ দেখাননি। বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল চালানোর চেষ্টাও করেছিলেন। জমেনি। সব শুনে তানিয়া শাহিন ভাইয়ের প্রতি উষ্মা প্রদর্শন করত, ‘তোমার শাহিন ভাই কবি কিংবা ভালো মানুষ হলেও সংসারী নয়। এমন লোককে ভালোবাসা যায়, সংসার করা যায় না।’ সত্যিই তো, এমন অকর্মা, সংসারবিভাগী মানুষকে নাজনীন আপু কীভাবে বিয়ে করতেন?

নিজে থেকে নাজনীন আপু অথবা তার প্রেম বিষয়ে কোনো দিন কিছু জানতে চাইতাম না। তবু একদিন কী কারণে শাহিন ভাই ভীষণ রকমের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেছিলেন, ‘শোন রবি, শিল্প-সাহিত্য একধরনের অলীক প্রেম। আর জানিসই তো প্রেম মানেই আত্মপীড়ন। এমন নিপীড়নে থাকলে একদিন তুইও হারিয়ে যাবি। তাই বলি, এই কদিন সাহিত্য-টাহিত্য বাদ দিয়ে কোনো একটা স্থায়ী চাকরি জোগাড় কর। পেটে ভাত না থাকলে সাহিত্য হয় না রে। প্রেমিকাও থাকে না।’

সেদিন তিনি আর কথা বাড়াননি। অশ্রু গোপন করতেই কি না কে জানে। হনহন করে চায়ের স্টল ছেড়ে চলে যান। তার পেছনে উড়ছিল একরাশ ধোঁয়া। সিগারেট পোড়াতে পোড়াতে কী আয়েশ করে তিনি পোড়াচ্ছিলেন নিজেকে, উড়িয়ে ছিলেন সব সাংসারিক প্রয়োজনীয়তা। আমি অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম শুধু। বুঝতে পারছিলাম, তিনি একটা নিবিড় দৈন্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এই অঙ্গনে যারা বিচরণ করেন, তাদের কয়জনই-বা অর্থনৈতিকভাবে এতটা সচ্ছল যে তাদের মতো মানুষকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবেন। আর আর্থিক সংগতির পরও তো সবার একটা একান্ত মানুষ লাগে। সেই মানুষটা তার কবে ছিল?

নাচের পুতুলের জীবনে আমরা সবাই সুতোয় ঝুলে থাকা নট-নটী। আর ওপরওয়ালা হলেন সূত্রধর। জীবনের নানা বাঁক-মোচড়ে আমি আর সাহিত্যের জগতে নেই। কিন্তু শাহিন ভাই থেকে গিয়েছিলেন।

হ্যাঁ, সেদিনকার শাহিন ভাইয়ের ভেঙে পড়া দেখে আমি বুঝতে পারলাম—নাহ, আদর্শিকতার বুদ্‌বুদের ভেতর দিয়ে জীবন চালানো যায় না। শুধু লেখালেখি আর সাহিত্য সংগঠন করে আমার দিন চলবে না। আমাকেও কিছু একটা করতে হবে। তাই ভেতরে ভেতরে নিজেকে সংসারমুখী করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

সংগত কারণেই তার সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাচ্ছিল। কোনো এক শুক্রবার সন্ধ্যায় এগারসিন্দুরে বাড়ি ফিরব বলে কমলাপুরে এসে দাঁড়িয়েছি। সঙ্গে তানিয়া ছিল। ও-ই আমাকে আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওই দ্যাখো, তোমার শাহিন ভাই।’ শাহিন ভাই তখন আপনমনে শলাকা ফুঁকছেন। আমরা কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি সিগারেটটা রেললাইনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরে তোরা! কই এসেছিলি?’ চাকরির পরীক্ষা দিতে এসেছি শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘যাক, কতকাল পর আমি আবার নাজনীনকে দেখতে পেলাম। হায় ঈশ্বর।’ তানিয়া খানিকটা বিব্রত বোধ করছিল।
পরে তিনি আমাদের সঙ্গে ওই কামরায় ওঠেননি। তার চলে যাওয়ার পর আমি তানিয়াকে সবিস্তার নাজনীন আপুর কথা বলি।

নাচের পুতুলের জীবনে আমরা সবাই সুতোয় ঝুলে থাকা নট-নটী। আর ওপরওয়ালা হলেন সূত্রধর। জীবনের নানা বাঁক-মোচড়ে আমি আর সাহিত্যের জগতে নেই। কিন্তু শাহিন ভাই থেকে গিয়েছিলেন। নৃ নামের একটি পত্রিকা বের করতেন। প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘রবি, তুই শাসনযন্ত্রে ঢুকে পড়েছিস। তাই আর তোর থেকে লেখা বেরোয় না। তবু সময় বের করে লিখিস। আমি তোর ভালো একটা গল্পের আশায় রইলাম।’ নৃ পত্রিকার প্রায় প্রতি সংখ্যা বেরোনোর আগে শাহিন ভাই আমাকে তাগাদা দিতেন, জানতে চাইতেন—নতুন কোনো গল্প আছে কি না। প্রতিবারই তাকে আমি নিরাশ করে দিই।

কী মনে করে সেদিন তানিয়াকে বললাম মগভর্তি কড়া লিকারের চা দিতে। মূলত শাহিন ভাইয়ের পত্রিকায় দেওয়ার জন্য একটা গল্প লিখব বলে ল্যাপটপে বসেছিলাম। এক বৈঠকে গল্পটি লেখাও হয়েছিল। তবে দস্তুরমতো ফেলে রেখেছিলাম পুনর্বার কাটাকুটি করার জন্য। আর অপেক্ষা করছিলাম কবে শাহিন ভাই নক করে বলবেন, ‘এই সংখ্যায় তোকে লিখতেই হবে,’ সে জন্য। তিনি আর নক করেননি।

পৃথিবী-মঞ্চ থেকে শাহিন ভাইয়ের পাঠ শেষ হয়ে গেল হঠাৎই। তাই সূত্রধর তাকে উঠিয়ে নিলেন। তার পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় যাবে না আমার সদ্য লেখা গল্পটি।

এই গল্পতেও কোনো না কোনোভাবে আমি শাহিন ভাইয়ের জীবনী আঁকতে চেয়েছিলাম। মূলত তার প্রেমজীবন, বিরহজীবন, বাউণ্ডুলেপনাকে একটা ফিকশনাল জার্নির ভেতরে দেখাতে চেয়েছিলাম। আর খুব করে চেয়েছিলাম এই গল্প শুধু তার পত্রিকাতেই ছাপা হোক। যেহেতু তা আর হচ্ছে না, তাই গল্পটির এখানেই পরিসমাপ্তি হোক। অন্য কোথাও প্রকাশিত না হোক। সে জন্য ব্যাকস্পেস চেপে পুরো পাতা খালি করে দিলাম।

এখন আপনারা যে লেখাটি পড়ছেন, তা মূলত সেই খালি পাতায় লেখা। সূত্রধর নাকি শূন্যতা পছন্দ করেন না।

নগুয়া, কিশোরগঞ্জ