পুরোনো দিনের সাদা-কালো দৃশ্যমানতার পরিপূর্ণ আমেজ ফিরিয়ে দেওয়ার একটি চলচ্চিত্র ‘ধারাপাত’। এই ছবি তখন নির্মিত, যখন চলচ্চিত্র নির্মাণের আধুনিক যন্ত্রপাতি, অত্যাধুনিক ক্যামেরা আসেনি। একই সঙ্গে একটি সেটে দুটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করে দৃশ্য গ্রহণ করার মতো ব্যস্ত পরিচালকও আসেননি। সারা বছর ধরে বা বছরের পর বছর একটি চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবনা–চিন্তা করতে করতে, ধরে ধরে গভীর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন প্রতিটি দৃশ্য বোনা হতো। ফলে নিপুণ সৃষ্টিশীলতা, উৎকর্ষ দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে প্রতিফলিত হয়।
‘ধারাপাত’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আমলে ১৯৬৩ সালে। পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্র বোর্ড গঠন করলে ঢাকায় সেই বছর দুটি বাংলা এবং তিনটি উর্দু চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, তার মধ্যে ‘ধারাপাত’ অন্যতম। একসময়ের কলেজের অধ্যাপনা করা সালাউদ্দিন চলচ্চিত্রটির পরিচালক। নিজের প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করে স্বাধীনভাবে এর আগেও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য সাজিয়ে, সংগীত পরিচালনাও করেছেন। কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা এবং অভিনেতা হিসেবে পাশে পেয়েছেন অন্য একজন দক্ষ সৃষ্টিশীল মানুষকে—আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন অল্প বয়স থেকেই লেখালেখি করতেন। নাটক হিসেবে রচনা করে নাটকের দল নিয়ে মঞ্চস্থ করেছিলেন ‘ধারাপাত’, তা মনে ধরে যায় পরিচালক সালাউদ্দিনের। এরপর নাটক থেকে চলচ্চিত্রের পর্দায় কাহিনির উত্তরণ।
ঘুরে ঘুরে সে গান করে বেড়ায়। বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। একজন শিল্পীর লড়াই করে বেঁচে থাকার যাবতীয় সংকটের কথাও উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে।
১৯৬৩ সালে ভেঙে যাওয়া বাংলার বুকের ওপর দিয়ে ইংরেজদের ফেলে যাওয়া নিদর্শন রেলগাড়ি ছুটছে। রেললাইন ছোটা মানে অজপাড়াগাঁয়ের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ। গ্রামের মানুষের সঙ্গে শহরের মানুষের জীবন বিনিময়। জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের শহরে ছুটে আসা; কিন্তু শহর কি পারবে এই ছোট ছোট প্রাণের জীবনগুলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে? উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে কাহিনির একেবারে শেষ প্রান্তে এসে। আমজাদ হোসেন থেকে সালাউদ্দিন—সবাই এভাবে গ্রাম থেকে শহরে ছুটে এসেছিলেন বড় কিছু করতে পারার নেশায়। নিজের চোখের সামনে অসংখ্য জীবনের জয়-পরাজয়, লড়তে লড়তে বেঁচে থাকা দেখেছেন তাঁরা। নিজের এবং পারিপার্শ্বিক যৌবনের সেই হতাশা, বিষণ্নতা উঠে এসেছে সৃষ্টিশীলতায়।
‘ধারাপাত’ নামকরণের সার্থকতা হিসেবে গ্রামের একজন দরিদ্র অঙ্কের মাস্টারকে আমরা এখানে পাই। সারা জীবন অসংখ্য সন্তানসম ছাত্রকে অঙ্ক শিখিয়ে গেছেন। অঙ্ক তাঁর জীবনের ধ্যান, জ্ঞান, শ্বাসপ্রশ্বাস; অথচ জীবনের চলার পথের অঙ্ক মেলাতে পারেননি কোনোদিন। সেই কঠিন অঙ্কে ঘুরপাক খেয়ে মরতে মরতে জরাজীর্ণভাবে বেঁচে ছিলেন। বাড়িওয়ালা এসে মাসের পর মাস বাড়িভাড়া না দিতে পারার জন্য বারবার তিরস্কার করে যান। স্ত্রী বলেন, ‘তোমার কাছে সব ছাত্র সারা জীবন বেশি বেশি নাম্বার পেয়ে গেল, কম নাম্বার পেলাম শুধু আমি আর আমার ছেলে।’ দরিদ্র জীবনের এই অভিমান মাস্টার সহজভাবেই নেন। আবার শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোগত অভিযোগও এই দরিদ্র স্কুলশিক্ষককে শুনতে হয়।
গ্রামবাসী এসে অভিযোগ করে, একই রচয়িতার একটি অঙ্কের বই ঠাকুরদা, বাবা এবং সে নিজে বংশানুক্রমে শেখে, পাস করে, ব্যবহার করে এসেছে। অথচ নিজের ছেলের জন্য নতুন পাঠ্যক্রমের নতুন বই কিনে দিতে হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের কাছে নতুন বই কেনাটাও কঠিন। আবার একটি বইকে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখা—এই বিষয়টিও কম শিক্ষণীয় নয়; কিন্তু অঙ্কের মাস্টারের ছাত্র পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বিড়ি বাঁধার কাজ করে, সেই সমাজব্যবস্থাও ইতিহাসের দিকনির্দেশ করে। ইংরেজদের ছেড়ে যাওয়া পাকিস্তান সরকারের হাতেও গ্রামবাংলার মানুষের দারিদ্র৵ ঘোচেনি। অঙ্কের মাস্টারের মেয়ে শিউলির বিয়ে হয় না। মায়ের কাছে চরম গরিবিয়ানার অভিমানের বশে কত কথা শুনতে হয়। মাস্টার তবু স্বপ্ন দেখে শহরে কাজ করতে যাওয়া ছেলে একদিন ফিরে আসবে। অনেক আয় করে নিয়ে আসবে। সেই আয় দিয়ে বাড়িভাড়া পরিশোধ করবে। দরিদ্র জীবনের নিরসন হবে। গ্রামের অন্য পড়শিও যখন নিজের ছেলেকে শহরে পাঠানোর জন্য মাস্টারের কাছে আসে, মাস্টার আশ্বাস দেন খোকনকে চিঠি লিখে চাকরির জন্য বলবে; কিন্তু শহরের পরিস্থিতিটা যে কী রকম, ওরা কেউ তখনো জানে না।
আমজাদ হোসেনকে এখানে আমরা পাই অন্য এক জীবনের অঙ্ক কষিয়ে গণিতবিদ ফটিক চরিত্রে। এই গণিতবিদের দার্শনিক তত্ত্ব বা জীবনের অঙ্কের নাম স্বাবলম্বী হওয়া এবং লড়াই করে স্বমর্যাদায়-আত্মনির্ভরশীলতায় বেঁচে থাকা। পড়াশোনা করা সুশিক্ষিত ছেলে হয়েও ফটিক অন্যের কাছে দাসখত লিখে দিয়ে চাকরি করে না। হাটে-মাঠে-ঘাটে, শহরে-বন্দরে দাঁতের মাজন বিক্রি করে বেড়ায়। শহরের হোটেলের পচা ভাত-তরকারি তার পেটে সয়ে যায়। এই কাজে ঝুঁকি আর বিড়ম্বনাও আছে। বিদেশি লেবেলের পণ্য দেদার বিক্রি হয় আর বেকার ছেলে দেশি পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে বাজারে মার খায়। উঠতে–বসতে লেবেলজাত পণ্যের ঝোঁক এবং কথায় কথায় বিদেশি পণ্যের প্রীতি তখনকার মানুষের মধ্যেও জেঁকে বসেছে বোঝা যায়। ফটিককে বাঁচাতে গেলে হিংসায় উন্মত্ত মানুষ দোতারা ভেঙে ফেলে ফটিকের সহচর যুবকের। ফটিক তবু অদম্য জীবনপোড়া মানুষ। স্বপ্নের কান্ডারি। গ্রামের যাত্রাদলের কাজ হারানো মেয়েলি প্রকৃতির স্বাভাবিক যুবকটিকেও নিজের দলে নেয়। সে যখন মাজন বিক্রি করবে, তখন যেন নেচে নেচে মানুষ জড়ো করে। একই সঙ্গে রয়েছে বিপণন কৌশল এবং স্বদেশি পণ্যের বাজারজাত করার নিপুণ সৃষ্টিশীলতার আনন্দ বিতরণ। গ্রামের গানপাগল অন্য এক যুবকেরও দেখা মেলে। বাবা তার মানসিক বিকারগ্রস্ত উন্মাদ, ঘরে অভাব; তবু ঘুরে ঘুরে সে গান করে বেড়ায়। বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। একজন শিল্পীর লড়াই করে বেঁচে থাকার যাবতীয় সংকটের কথাও উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে।
সাদা-কালো ছবিতে জীবনের সাদা–কালো দিককে গণিতের সূত্রে বিস্তৃত করে যায় ‘ধারাপাত’।
বহু আশায় সবাই তবু বুক বাঁধে শহর থেকে অঙ্কের মাস্টারের ছেলে বাড়ি ফিরবে। খোকনের প্রেমিকা হাতে বুনে রুমাল তৈরি করে, তাতে লেখা থাকে ‘ফরগেট মি নট’। কত সহজ–সরল এই জীবন এবং প্রণয় নিবেদন। ফটিকের সহচরের যে দোতারা ভেঙে দিয়েছিল, সে আবার দোতারা ঠিক করে নেয় খোকন ফেরার আনন্দে; কিন্তু শেষ দৃশ্য বড় মর্মান্তিক। সারা জীবন ধরে অঙ্ক কষে যাওয়া মাস্টারের ছেলে খোকন আর বাড়ি ফেরেনি। এত পড়াশোনা করেও শহরে সে একটি চাকরি জোটাতে পারেনি। একটি কারখানায় কাজ করতে গিয়েছিল, সেখানে নিজের ভুলের জন্য প্রাণ গেছে। এক বার্তাদূত এসে এই খবর দেয়। মাস্টার পাষাণ থেকে যেন পাথর হয়ে যান। খোকনের মা কাঁদতে কাঁদতে হাসতে শুরু করেন, উন্মাদ হয়ে বসেন। ফটিক তবু ঘুরে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার কথা বলে। সন্তানহারা গরিব অসহায় মাস্টার, সারা জীবন অসংখ্য ছাত্রকে ধারাপাত শিখিয়ে আসা মাস্টার ফটিকের কাছে আজ জীবনের নতুন ধারাপাত শিখতে চান।
এত দুঃখ, কান্না, যন্ত্রণার মধ্যেও স্বজন ফেরার আনন্দের বাতাবরণে গান আছে। ‘এত কাছে চাঁদ বুঝি কখনো আসেনি/ এমন ফাগুন লাগে কখনো দেখিনি...’ গানটা খুবই মধুর। ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত পরিচালনা করেছেন কলিম শরাফী। অন্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন এবং সুর সংযোজনায় ছিলেন ওস্তাদ ফজলুল হক, কলিম শরাফী, ফাহমিদা খাতুন, ইসমত আরা, কল্পনা রায়, হরলাল রায়, জাকির ও সিরাজ। অভিনয় করেছেন সুজাতা, হাসান ইমাম, নাসিমা খান, কাজী খালেক, সালেহা, সিরাজ, নিজাম উল্লাহ, মেজবাহ, রহিমা, মাহমুদ, রানু, মঞ্জুর, লালু মৃণাল, ফরিদ, কাসেম, খসরু আর আমজাদ হোসেন।
সাদা-কালো ছবিতে জীবনের সাদা–কালো দিককে গণিতের সূত্রে বিস্তৃত করে যায় ‘ধারাপাত’।
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত