একদিন মধ্যরাতে বমি করে বেসিন ভাসিয়ে দেখি রক্ত, মেসের কয়েকজন আমাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। টানা ৯১ দিন মুখে কিছু খেতে পারিনি। স্যালাইন পুশের ওপর বেঁচে ছিলাম। যে আমি ইনজেকশনের সুচ দেখলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম, সেই আমি কি না হাত পেতে নিতে থাকলাম একের পর এক ভ্যাকসিন। প্রতিদিন সাতটি করে সুচের গুঁতো। দুই হাতে দুটি ক্যানোলা। মুখে কিছু খেতে পারি না, স্যালাইন ভরসা।
সাড়ে চার মাসে জীবন সম্পর্কে এত দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা আমার দীর্ঘ ৩০ বছরেও হয়নি। বন্ধুরা প্রথম কদিন খোঁজখবর নিলেও সপ্তাহখানেক পর ভুলে যায়। শুরুতে তারা প্রায় প্রতিদিন আসত, পাশে বসে সেলফি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করত। তারপর একদিন আর খবর নেই। হয়তো বিরক্ত হয়ে গেছে! মেসের কেউ কেউ প্রথম দিকে ফলমূল নিয়ে দেখতে যেত, পরে তো ভুলেই গেল। দ্বিতীয় মাসে আমাকে জানাল, তারা আমার সিটে নতুন মেম্বার তুলেছে। মার্কেটিংয়ের চাকরি তো, এক মাসের বেতন অগ্রিম দিয়ে কোম্পানি জানায়, আমার পোস্টে নতুন লোক নেবে।

সবচেয়ে বেশি আঘাত পাই অর্পিতার কাছ থেকে। অর্পিতা আমার প্রেমিকা। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার পথে রাজশাহীতে প্রায়ই তার সঙ্গে সময় কাটাতাম। কথা ছিল বিয়ে করব। বহুবার পরিবার থেকে বিয়ের চাপ আসে, সে রাজি হয়নি, আমাকে বিয়ে করবে বলে। কিন্তু যখন জানল আমার এই দশা, বাঁচি কি মরি ঠিক নেই, তখন অর্পিতা অন্যের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেল। মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যু দেখার জন্য অপেক্ষা করে কী লাভ!
ঢাকা মেডিকেলের ৯৩৬ নাম্বার বেডে শুয়ে থেকে খুব অস্বস্তি লাগত। মাকে বলতাম, ‘আমাকে একটু ছাদে নিয়ে যাবে?’ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, তাই বিকেলে ডাক্তারেরা অফ-ডিউটিতে গেলে মা আমাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ছাদে রেখে আসতেন। আমি আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম, গাছ মরে যাওয়ার আগে তার উঁচু ডালপালা আর দূরবর্তী শিকড়গুলো মরে যেতে থাকে। মানুষের মরা শুরু হয় তার স্বপ্ন ও আশার মৃত্যু থেকে। তবে কি বিধাতা আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন?

কিন্তু আমার মা তো আমাকে মরতে দেবেন না। যমদূতের থাবা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে সব সময় পাহারায় থাকছেন, প্যাঁচার ছোঁ থেকে বাচ্চাকে বাঁচাতে যেমন সতর্ক থাকে মেঠো ইঁদুর।
মাদ্রাজ নিতে হলে অনেক খরচ। পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং। বাড়িভিটা ছাড়া আমাদের যা ছিল মা সব বেচে দিলেন। একমাত্র ছেলেই যদি বেঁচে না থাকে, সম্পত্তি দিয়ে কী হবে!
এদিকে বিধাতার কী খেলা! তিনি হয়তো মায়ের ভালোবাসা পরীক্ষা করতে চাইছিলেন। আমার মা সর্বোচ্চ মার্ক পেয়ে গেলেন। যেদিন জমি-সম্পত্তি বেচা শেষ, সেদিনই আমি দুচামচ ডাবের পানি মুখে নিয়ে গিলে ফেললাম, নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি এল না। তারপর ধীরে ধীরে চামচের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য সব খাবারের দিকেও হাত বাড়ালাম।
এখন ঢাকা মেডিকেলের দিকে গেলে ৯৩৬ নাম্বার বেডের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মনে মনে ভাবি, কী দিন গেছে আমার! অসুস্থতার সময় যেসব নার্সের সঙ্গে কিছুটা খাতির হয়েছিল, তারা আমায় টুকটাক কুশল বিনিময়ের পর বলে, ‘যে দশা হয়েছিল আপনার, ঈশ্বর নিজ হাতে রেখে না গেলে বাঁচার কথা ছিল না...।’

হারুয়া, কিশোরগঞ্জ

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন