চড়ুই পাখিটা প্রতিদিন সকালে চা খেতে আসে। আমি প্রচণ্ড চা–খোর। সারা দিন কোনো কাজ নেই। চা খেয়ে সময় পার করি। সম্ভবত চড়ুই পাখিটাও তা–ই। সকাল-বিকেল নিয়ম করে চা খেতে আসে। আমি বেকার আর চড়ুই পাখিটারও কোনো কাজ নেই। ঘর-সংসারহীন বলেই আমার ধারণা। আমি গুহাজীবন যাপন করি। মানে সারা দিন ঘরে শুয়েবসে থাকি। জীবনটা কাজের জন্য নয়, আরামের। আমার খুব দেখার ইচ্ছা, সারা জীবন আরাম–আয়েশে জীবন পার করার অনুভূতি কেমন। বাবার রেখে যাওয়া টাকায় আরাম-আয়েশে দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে।
আমার চা আসে সকাল সাড়ে সাতটায়। কাজের মেয়েটা রেখে যায় ঠিক জানালার কাচ ঘেঁষে। সে রকমই বলা আছে; যাতে পাখিটার ঠোঁট চায়ের কাপের নাগাল পায়। পাখিটা ঠিক ঠিক সাড়ে সাতটায় হাজির হয়। একেবারে রুটিন করে আসে। কীভাবে সময় বুঝতে পারে, জানি না। মনে হয় সূর্য দেখে। একসময় মানুষও সময় দেখতে সূর্যের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু মেঘলা দিনেও চড়ুইটা ঠিক সময়মতোই হাজির হয়। পাখিটার সময়জ্ঞান দেখে আমিই অবাক হই।
আমার নিজেরই তো এত সময়জ্ঞান নেই। অবশ্য আমার সময়জ্ঞানের দরকারও নেই। কাজ থাকলে মানুষের সময়ের হিসাবের দরকার হয়। কাজ না থাকলে তার আর দরকার কী? আমার গুহাজীবনের একমাত্র সাক্ষী এই চড়ুই পাখি। কোনো না কোনো সাক্ষী তো থাকতেই হবে। থাই গ্লাস দিয়ে জানালাটা আটকানো থাকে। পাখিটা এসে ঠোঁট দিয়ে জানালায় আঘাত করে। ঠকঠক শব্দ হয়। ঠিক যেমন দরজায় কেউ কড়া নাড়ে, তেমন। অপেক্ষা করতে হয় না। আমি ঘুম চোখে গ্লাসটা ঠেলে খুলে দিই। তাকে ভেতরে স্বাগত জানাই। পাখিটা মাথা গলিয়ে কাপে মুখ দেয়। আমার কাছ থেকে অনুমতির অপেক্ষা করে না। নির্লজ্জ ধরনের। আমিও নির্লজ্জ। পরিবারের সবাই এত অপমান করার পরও কিছু করার চেষ্টা করছি না। আসলে আমার তেমন কিছু করারও নেই। দুজনের স্বভাব–চরিত্রে দারুণ মিল ভেবে আমি উচ্ছ্বসিত হই। অন্তত প্রাণীকুলেও কেউ আছে আমারই মতো।
আবার যদি জন্ম হতো, তাহলে চড়ুই হয়ে জন্ম নিতাম। অন্য কারও কাপের চা খেয়েই দিব্যি একটা জন্ম পার করে দিতাম। চড়ুই পাখিটা চা খাওয়া শেষে আমার দিকে পিটপিট করে তাকায়। মনে হয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ওর চোখে তা ধরা পড়ে না। কুকুরের চোখে কৃতজ্ঞতাবোধ ধরা পড়ে। পাখির পড়ে কি না, জানা নেই। আবার মানুষের চোখেও এসব ধরা পড়ে। কৃতজ্ঞতাবোধ চোখের ভাষায় ফুটে ওঠে। আমি অবশ্য এত কৃতজ্ঞ নই। যার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার কথা, মানে বাবা, সে তো আর বেঁচে নেই। তার টাকায়ই তো চলছি। যখন শেষ হবে, তখন দেখা যাবে। আমি চড়ুই পাখির এঁটো কাপেই চা খাই। প্রথম প্রথম ঘেন্না লাগত। এখন আর ঘেন্না লাগে না। দুজনই তো এক। আমি অপেক্ষা করি, চড়ুইজন্মের।
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, পাবনা