মেথর সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র ‘রামগোলাম’

হরিশংকর জলদাসের ‘রামগোলাম’

উঁচু জাত, নীচু জাত, ধনী, গরিব—এসব পার্থক্য অতীত থেকেই বর্তমান সমাজে প্রবেশ করেছে। এই পার্থক্য স্বয়ং মানুষই করেছে। বিভিন্ন সময় শাসকেরা নিজস্ব প্রয়োজনে বা নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই পার্থক্য তৈরি করে গেছেন, যা সমাজে আজও বিরাজমান। গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বললেই হবে না, আমরা আধুনিক হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজের গোড়া এখনো তলিয়ে আছে, যা সহজে সংস্করণ সহজ নয়। তবু মানুষ চেষ্টা করছে, এটা সত্য।

পৃথিবীতে জোর যার মুল্লক তার, কথাটার অনেক বড় তাৎপর্য রয়েছে। সমাজে সব সময়ই শাসকগোষ্ঠীরা নিজেদের স্বার্থে সমাজের নিয়মের পরিবর্তন করেছেন। ক্ষমতা আর অধিকার খাটিয়ে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করেছেন।

হরিশংকর জলদাসের ‘রামগোলাম’ উপন্যাসটি সে সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। মেথর সম্প্রদায়ের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত এই উপন্যাসে তাদের জীবনের কঠিন সত্যগুলো বের হয়ে এসেছে। নীচু জাতে জন্মগ্রহণ করে প্রতিনিয়ত জীবনের অধিকার আদায় করার জন্য লড়তে হয় তাদের।

চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারসংলগ্ন মেথরপট্টিতে পাঁচতলার দুটি বিল্ডিং রয়েছে। বিল্ডিং দুটিতে প্রায় ৭০টি পরিবার বাস করে। প্রতিটি পরিবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র দুটি ঘর। মেথর পরিবারগুলো তাই কষ্ট করে কোনো রকম জীবনযাপন করে এখানে। ছেলেকে বিয়ে করানোর পর তাঁদের ঘরে মানুষ বাড়ে; কিন্তু ঘর বাড়ে না। ছেলে বিয়ে করলে মা-বাবার শোবার স্থান হয় রান্নাঘরে।

এই ফিরিঙ্গিবাজারে ঝাউপট্টি, বান্ডেলপট্টি, মাদারপট্টি ও মেথরপট্টি রয়েছে। এই চারটি পট্টির হরিজনপল্লির সরদার হচ্ছেন গুরুচরণ জলদাস। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে গুরুচরণ এই মেথরপট্টিতে বসবাস করছেন। ঘরে স্ত্রী অঞ্জলি বাঈ, ছেলে শিউচরণ, ছেলের বউ চাঁপারানি আর একমাত্র নাতি রামগোলাম।

এই কলোনিতে একটা প্রাইমারি স্কুলও রয়েছে। মেথরপট্টির লাগোয়া স্কুলটির নাম ফিরিঙ্গিবাজার সেবক কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রথম যখন এই স্কুলটি হয়েছিল, তখন শুধু মেথরপট্টির ছেলেমেয়েরাই পড়ত। তাদের কথা চিন্তা করেই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হতে লাগল। মেথরপট্টির ছেলেমেয়েরা ছাড়াও বাইরে থেকে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করানো হলো স্কুলে। এতে মেথরপট্টির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। নানা প্রতিবাদ করেও তা আটকানো গেল না।

তারপর এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করতে হলো মেথরপট্টির ছেলেমেয়েদের ভাগ্যে পড়াশোনার ভাগ মিলবে কি না। শিক্ষক ও পরিচালনা ভালো হলে ছেলেমেয়েরা পড়তে পারে, তা না হলে পারে না। পট্টির সঙ্গে লাগোয়া স্কুলের দেওয়াল হওয়ার পর ব্যবধান আরও বাড়তে লাগল। তাই মেথরপট্টির ছেলেমেয়েদের কয়েক ক্লাসেই লেখাপড়ার পাট চুকে যেত। স্কুলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হতো। ক্লাস থেকে বের করে বারান্দায় বসিয়ে পড়ানো হতো বা ক্লাসের শেষের বেঞ্চগুলোতে মেথরপট্টির ছেলেমেয়েদের বসতে দিত।

মেথরপট্টির সরদার গুরুচরণ অনেক বছর ধরে করপোরেশনের গাড়ির ড্রাইভারি করছে। প্রথম যখন সে গাড়ি চালানো শুরু করে তখন গাড়িটাতে সে নিজে রং করেছিল। টাট্টি টানার গাড়ি হলেও দেখতে ভালো দেখাত। তবে এখন আর সেই জৌলুশ নেই, হয়ে গেছে লক্কড়ঝক্কড়।

এত কিছুর মধ্যেও গুরুচরণের নাতি রামগোলাম ম্যাট্রিক পাস করল। চারটি মেথরপট্টির মধ্যে একমাত্র রামগোলামই ম্যাট্রিক পাস করতে পেরেছিল। তাই তাকে হরিজনপল্লির লোকেরা গুরুচরণের পর রামগোলামকে কলোনির সরদার নির্বাচিত করে। গুরুচরণের ছেলে শিউচরণ বাপের মতো সাহসী ও বিচক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী না হলেও নাতি রামগোলাম হয়েছে।

এই মেথরপট্টির মানুষের ভাগ্য এতটাই খারাপ যে ভদ্র সমাজের মানুষেরা প্রতিনিয়ত তাদের হেনস্তা করে, অপমান করে, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তারা চাইলেও ভদ্রসমাজে গিয়ে বাস করতে পারে না। কারণ, তাদের মানুষই মনে করা হয় না। তারা না হিন্দু, না মুসলিম, না খ্রিষ্টান, না বৌদ্ধ, তারা হলো মেথর। তাদের ছোঁয়া লাগলে পাপ হবে। স্নান করে ঘরে যেতে হবে। তারা মানুষের ফেলা ময়লা, আবর্জনা ও টাট্টি নিয়ে কাজ করে। এ রকম নীচু জাতের মানুষদের ভদ্রসমাজের লোকেরা মানুষ বলে গণ্য করতে নারাজ। তাই তারা মেথরপট্টি ছাড়া অন্য কোথাও বাস করতেও পারে না।

মেথরপট্টির একটি পরিবার ঘরে জায়গা হয় না বলে পরিচয় লুকিয়ে ভদ্রসমাজে বাস করতে গিয়েছিল। যখন তারা তাদের পরিচয় জানল তখন দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল।
মেথরপট্টির মেয়েদের পোশাক দেখেও অন্য লোকেরা টিটকারি মারে, তারা প্রতিবাদ করে, তবে সেটা বহুদূর যায় না। তাদের মধ্যে কেউ মরলে শ্মশানে পোড়াতে দেয় না। নীচু জাতের বলে তিরস্কার করে। সেখানেও লড়তে হয়।

করপোরেশনের ওপর নির্ভর করে এই মেথরপট্টির লোকদের ভাগ্য। অতীতে মোগলরা, জমিদার, বাদশারা ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের এ দেশে এনে এই কাজে যুক্ত করে বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেগুলো নেই। রেশনসহ বিভিন্ন সুবিধা বন্ধ করা হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। শুধু থাকার জন্য ঘরটা রয়েছে। সে–ও করপোরেশনের নিয়মের মধ্যে। চাকরির মেয়াদ শেষ হলে ঘরও ছাড়তে হবে।

করপোরেশন বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এসব মেথরপট্টির লোকদের সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করে। অবাক করা বিষয় হলেও এটা সত্য যে মেথরপট্টির কিছু অসাধু সামান্য লাভের আশায় এসব করতে সহায়তা করে। তাদের মধ্যে অন্যতম যোগেশ। যোগেশ করপোরেশনের অফিসে কাজ করে।

করপোরেশনের বড় অফিসার আবদুস ছালাম। এই মেথরপট্টির অসহায় মানুষের পেটে লাথি দেওয়ার পদ্ধতিগুলো আবিষ্কার করেন। তিনি মেথরপট্টির মন্দিরের জায়গায় ইচ্ছা করে মাংস কাটার কসাইখানা তৈরি করলেন। করপোরেশনের কাজে মেথরসহ অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের কাজ করতে দেওয়া অনুমতি দিয়ে মেথরদের কাছ থেকে আলাদা সুবিধা কেড়ে নিতে চান। মেথরপট্টির সবাই যখন এক জোট হয়ে আন্দোলন করল, তখন এক মহাকাণ্ড হয়ে গেল। একজন খুন হলো এবং বড় সাহেব চক্রান্ত করে সে খুনের দায়ে রামগোলামকে জেলে পাঠাল। জেল থেকে ফিরে মেথরপট্টির এলাকায় অনেক পরিবর্তন লক্ষ করে সে। নতুন করে আবারও এই মেথরপট্টির লোকদের দাবি আদায়ে আন্দোলন করার ইচ্ছা তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধে। রামগোলাম স্বপ্ন দেখে এই পট্টির ভাগ্য পরিবর্তনের, নতুন সূর্য ওঠার।