সালেহা বেগম বলেন, ঘরে না, মেয়ের মাথার ভেতর তালগাছ। সে গাছে কিছু একটা বসে আছে। তুমি আর হেলাফেলা কোরো না। বাড়িতে জিন–ভূতের আখড়া বসেছে।
কবিরাজ, পির-ফকির দিয়ে চেষ্টা চালানো হলেও কোনো উন্নতি হয়নি। পড়াশোনা, খাওয়া, ঘুম সব কিছুতেই নিপার অভক্তি। দিন দিন তালগাছ ভীতি কমে তালগাছপ্রীতি বাড়ছে। অফিসের এক বন্ধুর পরামর্শে নিপাকে নামকরা এক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার ইকবাল কবিরের চেম্বারের সামনে অনেক সময় বসে থাকতে হয়। একটা সময় নিপার সিরিয়াল আসে। ডাক্তার মাঝবয়সী ছিপছিপে গড়নের। খুব লম্বা না হলেও তাকে খাটো বলা যাবে না। দুজনের দিকে পিটপিট করে তাকান। রোগী কে? নিপা জবাব দেয়, আমি।
ডাক্তার একগাল হেসে বলেন, বেশ। কী সমস্যা আপনার?
- আমার একটা তালগাছ আছে।
- একটা কেন দশটা তালগাছ থাকলেই বা কী। সারা দেশে অসংখ্য তালগাছ থাকা দরকার। এই যে বজ্রপাতে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, অসংখ্য তালগাছ থাকলে এত মানুষ মারা যেত না।
- আমার তালগাছটা হেঁটে বেড়ায়।
এবার ডাক্তার ভ্রুকুঞ্চন করে বলেন, আর কিছু?
- তালগাছে ও... বসে থাকে।
- ও মানে!
- আপনি দেখবেন?
ডাক্তার কাগজে নোট করেন। তালগাছ হেঁটে বেড়ায়। সেটা অন্যকে দেখাতে চায়। তালগাছেও বসে থাকে। লেখা শেষ করে আবার নিপার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, আর কিছু?
নিপা স্বাভাবিক গলায় বলে, আমার প্রশ্নের জবাব দেননি।
- কী প্রশ্ন! কী জবাব?
- তালগাছটা আপনি দেখবেন?

ডাক্তার ইকবাল কবির গালভারা হাসি দিয়ে বলেন, এটা আপনার অলীক কল্পনা। ওষুধ লিখে দেব, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। নিপা চুপ করে বসে থাকে। ডাক্তার হঠাৎ করে কেঁপে ওঠেন। তার চোখেমুখে ভয়, উদ্বেগ। নিপা মৃদু হেসে বলে, দেখতে পাচ্ছেন?
ইকবাল কবির বিড়বিড় করে শুধু বলছেন, এটা আমার অলীক কল্পনা। তার টেবিলের ওপর বিরাট একটা তালগাছ। ছাদ ফুটো হয়ে মাথা বেরিয়ে গেছে আকাশে। তালগাছের মাথায় বসে আছে আগুন চোখা এক অদ্ভুত প্রাণী। অনেকটা মানুষের মতো। বড় বড় হাত। হাত–পা কালো কালো পশমে ভরা। নাকটা অনেকখানি লম্বা হয়ে সামনের দিকে ঝুলে আছে। তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাসির সঙ্গে বড়সড় দাত গুলো বিশ্রীভাবে বিকশিত হচ্ছে।
তিনি ঘামছেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। রোগী ফেলে দৌড়ে চেম্বার থেকে পালিয়ে যেতে পারলেই যেন বেঁচে যান। তাতে মানসন্মান সব ভূলুন্ঠিত হবে। সারা দুনিয়ার মানুষ হাসবে।

নিপা কথা বলে আবার, আপনার স্ত্রীর নাম নিশি তাই না? ডাক্তার যতটা না অবাক হন, তার চেয়ে বেশি আতংকিত। কাঁপা কাঁপা গলায় ঘাড় নাড়েন, হু।
- তিনি খুব দ্রুতই আপনার কাছে ফোন করবেন।
তালগাছটা নেই। নিপার কথায় আবেগ বা কল্পনাপ্রসূত হয়ে তিনি তালগাছ দেখেছেন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে তিনি বেল বাজান। একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়, মেয়েটা স্ত্রীর নাম জানল কীভাবে! আবার বলছে খুব দ্রুতই ফোন করবে। নামটা হয়তো কোনোভাবে মিলে গেছে। বাকিটা তার পাগলামি।
একজন তরুণী ভেতরে প্রবেশ করে। বয়স কুড়ি–বাইশের মতো। চেহারা মোটামুটি মায়াবী, শ্যামলা বর্ণের।
- জি স্যার।
- তিনটা কফি নিয়ে এসো।
- ওকে স্যার।
মেয়েটা অল্প সময়ের মধ্যে তিন কাপ কফি দিয়ে চলে যায়। কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ডাক্তার দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। টেলিফোন বেজে ওঠে। ডাক্তার রিসিভার কানে ধরেন, হ্যালো।
ওপাশে তার বউ নিশির আর্তনাদ, তুমি কোথায়...
- উদ্বিগ্ন, কেন কী হয়েছে!
- বড় একটা তালগাছ।
- হ্যাঁ।
- ছাদ ফুটো হয়ে মাথা বেরিয়ে গেছে আকাশে...।
ডাক্তারের হাত থেকে কফির পেয়ালা নিচে পড়ে কড়মড় শব্দে ভেঙে যায়। সেদিকে মনোযোগ নেই তার। ও–প্রান্তে নিশির বিকট চিৎকার, বড় বড় চোখে আগুন জ্বলে...
কাঁপা কাঁপা গলায় স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেন ডাক্তার, ভয় নেই। আমি আসছি। কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়ান। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন, বড় একটা তালগাছ। তালগাছে কী বসা! তালগাছটা হেঁটে বেড়ায়।

নিয়াজ সাহেব ফ্যালফ্যাল চোখে ডাক্তারের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন। নিপা নির্বিকার। কফি দেওয়া মেয়েটা ভেতরে এসেই প্রশ্ন করে, স্যার চলে গেল যে! কিছু বলতে পারবেন? বাইরে অনেক রোগী। নিপা খিলখিল করে হেসে বলে, স্যার তালগাছ দেখতে বাড়ি গেছেন। তালগাছটা কিন্তু হাঁটে। মেয়েটা এ ধরনের কথা শুনতে পুরোপুরি অভ্যস্ত বোঝা যায়। বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ নিয়েই তাদের দিন–রাত।
নিয়াজ সাহেব নিপার হাত ধরে বলেন, চল মা বাড়ি যাই।
- হু, চলো।
বাড়ি ফিরে নিয়াজ সাহেবের মন বিষন্নতায় ভরে ওঠে। কয়েক মাস আগে গ্রাম থেকে দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের পরিবারকে ফ্রি খাওয়া-পরা দেবার শর্তে বাড়িতে উঠিয়েছিলেন। আবদুল গনি গরিব বলেই হয়তো তিন ছেলেমেয়ের পরিবার নিয়ে থাকতে রাজি হয়। আজ সকালে তারাও চলে গেছে।
সকাল হতেই আব্দুল গনি দোতলায় ওঠে হাক দেয়, ভাই সাব। নিয়াজ ভাই....
নিয়াজ সাহেব কাছে যেতেই আবদুল গনি মলিন মুখে বলে, ভাই আজ চলে যাব।
- কেন? গরিব মানুষ আয়–রোজগারের কষ্ট। খাওয়া দাওয়ার কষ্ট। এখানে আরামে খাওয়া দাওয়া করছ। যাবে কেন!
আব্দুল গনির মুখটা উজ্জ্বল হবার বদলে ফ্যাকাসে হয়। মলিন মুখে বলে, কাল রাতে কী হইছে জানেন?
- না।
- ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। সবাই ঘুমে। একটা মেয়ের করুণ সুরের কান্নায় ঘুম ভেঙে যায়।
- তারপর?
- ভাবছিলাম এত রাতে কাঁদবে কে! কান খাড়া করে শুনি পুকুর পাড়ের দিক থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে।
- হু।
- পৃথিবীর এমন কোনো বীরপুরুষ নেই যে ওই কান্না শুনে ভয় না পেয়ে থাকতে পারে। কান্নার সে আওয়াজ যদি আপনারে শোনাতে পারতাম।

নিয়াজ সাহেব গম্ভীর গলায় বলেন, শোনাবার দরকার নেই।
আবদুল গনি আবার শুরু করে, তারপর সারা দিক আলো আলো হয়ে যায়। বিকট হাসি। ভাইজান পেতনির হাসি শুনেছেন কোনোদিন?
- না শুনিনি।
আবদুল গনি আবার শুরু করতে যায়। নিয়াজ সাহেবের বাকিটা শুনতে ইচ্ছা করে না। কোনো এক অজানা আতঙ্কে গা ছমছম করে। থামিয়ে দেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, যেতে চাইলে যাবে।
সূর্যের আলো ফুটতেই পরিবার নিয়ে আবদুল গনি বিদায় নেয়।
গভীর রাত। নিয়াজ সাহেব জেগে আছেন। বেশ চিন্তিত। মানুষ খুশি, ব্যথিত বা চিন্তিত হলে সবার আগে সেটি মুখে প্রকাশ পায়। সালেহা বেগম আর জুয়েল ঘুমে। নিপা চোখ বুজে আছে তবে ঘুমিয়েছে কি না, বোঝা যাচ্ছে না। জানালার পাশ দিয়ে একটা তালগাছ হাঁটছে। তালগাছের মাথায় বসে আছে আগুনচোখা এক দানব। কী ঘটছে এসব? পৃথিবীর সব ঘটনার কারণ, সব প্রশ্নের জবাব মানুষ জানে না। হয়তো জানবেও না কোনোদিন।

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন