‘হাজার বছর ধরে’ যেভাবে চিরকালীন চলচ্চিত্র হয়ে উঠল

‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কিংবদন্তি অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা ছিলেন কিংবদন্তি লেখক ও পরিচালক জহির রায়হানের এক উজ্জ্বল আবিষ্কার। নিজের চলচ্চিত্রের জন্য তিনি দূরদর্শী হয়ে এমন এক শিল্পীকে সামনে এনে গড়েপিটে নিলেন, ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি শুধু আলোকদ্যুতি ছড়ালেন না, স্রষ্টা পরিচালকের জীবনসঙ্গী হয়ে ধারাবাহিক সৃষ্টিশীলতারও অংশ হয়ে উঠলেন। জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতার মূলভাব, সৃজনশীল চেতনার মূলধারার সঙ্গে মিশে যেতে পারলেন।

নিজের ভেতরের সৃষ্টি–চেতনা দিয়ে এই গুণী শিল্পী কালজয়ী শিল্পীর ভেতরের অক্ষরপুরুষকে, ছবি নির্মাণের দর্শনপুরুষকে পরতে পরতে বুঝে নিতে পারলেন। আর পারলেন বলেই, লেখক পরিচালক বোদ্ধার অকালপ্রয়াণের বহু বছর পরও তাঁর কালজয়ী রচনা নিয়ে একটি সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নজির গড়তে পারলেন। এখনো দেখলে বোঝা যায়, নিজের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে জহির রায়হানও সুচন্দার মতো করেই নির্মাণ করতেন।

জহির রায়হান নিজের রচনার মধ্যে যেভাবে এই সুন্দর বঙ্গদেশের দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে গিয়েছেন, সমাজবাস্তবতা জনজীবনের ইতিহাসের ছবি এঁকেছেন, গণমানুষের মুখের সংলাপ, বুকের সুর, হৃদয়ের গীত রচনা করেছেন, সুচন্দা নিজের পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্রে অক্ষরে–অক্ষরে তাকে জীবন্ত ভাষা দিতে পেরেছেন। উপন্যাসের পাতার পর পাতা আলোকিত হয়েছে চলচ্চিত্রে। জীবনের সমাজের গাঢ়তর অন্ধকারও মননশীল ভাষায় উঠে এসেছে।

দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন জহির রায়হান। মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছেন শিল্পযোদ্ধা ছোট ভাই। দেশের মুক্তির জন্য এককালে স্বপ্ন রচনা করেছেন। সেই স্বপ্ন থেকে স্বর্গের দেশ উঠে এসেছে। দেশমাতৃকা আপন সন্তানকে বুকে ধরে রেখেছে। তাঁর সৃজনশীল স্বপ্নসত্তাকেও দেশের মানুষ হারিয়ে যেতে দেয়নি। সুচন্দা কান্ডারি হয়ে এই প্রবাদপ্রতিম অক্ষরপুরুষের মহাকালের মহাতরির হাল ধরেছেন।

পরিচালক সুচন্দার চলচ্চিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য বারোমাস্যা বাংলার অপরূপ অনবদ্য চিত্রায়ণ। গ্রামবাংলা তার প্রকৃতির চিরন্তনী সাজ নিয়ে এই চলচ্চিত্রের পরতে পরতে ধরা দিয়েছে। এই কাজ বড় কঠিন। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সাধনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর কঠিন অধ্যবসায়ের নিপুণতর বাস্তবায়নের প্রয়াসের ফসল। এককথায় বলা যেতে পারে, বিরহ রিক্ত ব্যথিত সুচন্দার কাছে ছিল ‘হাজার বছর ধরে’ এক লক্ষ্যযাত্রা, এবং নতুন করে জহির রায়হানের সঙ্গে মধুময় ভালোবাসার ঘর–সংসারের একটা দীর্ঘ সফর। মহাকালজয়ী সাধকের সাধনার তীর্থক্ষেত্র তো মরে না, সেই তীর্থক্ষেত্রকে এভাবেই ধন ধান্যে গন্ধ পুষ্পে ফলন্ত করে তুলতে হয়। সাধকের উপযুক্ত সাধিকা হয়ে আপন মৌলিক সত্তায় তিনি তা পেরেছেন। আবার তুমি যা দেখাবে আমি তা দেখাব, শুধু তা নয়। কোনো শিল্পযাত্রাই এভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। তার থেকেও এখানে বড় হয়ে উঠেছে তোমার দেখার সঙ্গে আমার দেখা মিলিয়ে, তোমার সত্তার সঙ্গে আমার সত্তা মিলিয়ে আমাদের যৌথ শিল্পযাত্রার প্রতিফলন। এক সমবেত মিলিত দর্শনের ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎ যাত্রা।

আরও পড়ুন

সূচনাশীর্ষ সুর থেকেই এই শিল্পায়িত অভিনব মননশীল যাত্রা প্রতিফলিত হতে থাকে। অজগরের মতো এঁকেবেঁকে  চলে যাওয়া মেঠো পথ। চারদিকে অফুরান জলরাশি। পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল, ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে আসি; কিন্তু আদিমকালে চারদিকে শুধু বনজঙ্গল ছিল না, এভাবেই অফুরান জলের তলায় নিমজ্জিত ছিল সভ্যতা—তা অনুভব করা যায়। বনজঙ্গল কেটে অনেক জলভাগকে স্থলভাগে পরিণত করেও বসতি স্থাপন করে মানুষ এগিয়ে গিয়েছে। কাশেম শিকদার যেমন বন্যার জলে ভেলায় ভাসতে ভাসতে তার ছমিরন বিবিকে নিয়ে এই পরীর দীঘির পাড়ে এসে পড়ে, বসতি গড়ে তোলে। এই ভেলায় ভেসে আসার দৃশ্য সুন্দর মুনশিয়ানায় ফুটে ওঠে। ভেলা বলতে সাহিত্যের দর্শনে আমরা চিরকাল বেহুলা লখিন্দরের ভেলাযাত্রাকে স্মরণ করে এসেছি। আদিকালের মানুষের নিরুপায় ভাসন্ত যাত্রাও ছিল ভেলা।

লাঙল আর গরু দিয়ে চাষ করা মাঠ, ফসল তোলা, ধান ভানা, গরু–ভেড়ার পাল, পশুপাখি, ঢেঁকি, ধান রাখার বড় পাত্র, খরের টাল, নদী-মাঠ-ঘাট প্রকৃতি, নৌকা, গরিব মধ্যবিত্তের ঘরবাড়ি, গৃহসজ্জা, কূপিবাতি, আয়না, মাছের জাল, ছিন্ন জাল বুনে নেওয়া, রাতের অন্ধকারে অন্যের পুকুরে চুরি করে মাছ ধরা, মাঠের সাপ, ফলন্ত খেত, ঘরোয়া রান্নাবান্না, যাবতীয় নিত্যকর্ম—সব মিলিয়ে শাপলা-পদ্মের পরীর দীঘির গ্রাম এবং পরবর্তী সময়ের পরিবারগুলোকে নিখাদ অকৃত্রিম জীবন্ত করে তুলেছে। একজন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত মানুষের কন্যার বিয়ের সাজসজ্জা, বাড়ির সাজসজ্জা, অতিথি বরণের আয়োজনের কৌশল—এসব কিছুই একেবারে অবিকল উঠে এসেছে চলচ্চিত্রে। একবারের জন্যও মনে হয় না, চলচ্চিত্রের শুটিং করার জন্য আলাদা করে করা।

ঘরোয়া নারীর চিরন্তন ত্যাগী জীবন, কষ্ট চেপে রেখে সংসার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অন্ধকার জীবনযাপন অবস্থান, নারী নির্যাতন—এই সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে প্রদীপের শিখা হয়ে উঠেছে বলা যায়। পরীর দীঘি গ্রামে বসতি গড়ে সফল মানুষ হয়ে ওঠা কাশেমের জীবনেও শান্তি ছিল না। কারণ, ছমিরন তাকে সন্তান দিতে পারেনি। অথচ এই নারী নিজে স্বামীর মনঃকষ্ট বুঝতে পেরে নতুন করে নিকা করার পরামর্শ দেয়। নতুন সতিনকে স্বামীর সঙ্গে বাসরঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে। জলে মুখ–হাত ধুয়ে পবিত্র হয়ে ধুতুরা ফুল খেয়ে আত্মহত্যা করে। এভাবেও যে কেউ সংসার সাজিয়ে দিয়ে নিজেকে অধিকারহীন করে চলে যেতে পারে—গ্রামবাংলার নারীদের অলিখিত ইতিহাসে এমন ঘটনা অমিল নয়।

সেই একই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম মকবুল শিকদারকে আমরা দেখি তিন বউ নিয়ে সংসার করছে। তৃতীয় বউ টুনি একেবারে কিশোরী। এই টুনি আবার বৃদ্ধ মকবুলকে চতুর্থ বিয়ে করার পরামর্শ দেয়। কারণ, মকবুলের দুঃসম্পর্কের ভাই, অবিবাহিত দেবর মন্তুকে সে মনে মনে ভালোবাসে। ভালোবাসার বুকে চেপে রাখা কথাটা মুখে যদিও কোনো দিনই বলতে পারে না। এই মন্তুর সঙ্গে আম্বিয়ার বিয়ে ঠিক হয়। সেই বিয়ে যাতে না হয়, একপ্রকার সেই কারণেই মকবুলকে চতুর্থ বিয়ে করে সুন্নত পূরণ করতে বলে। আর বৃদ্ধ মকবুল বিয়ের নেশায় পাগল হয়ে আমেনা আর ফাতেমা প্রথম দুই বউকে তালাক দিয়ে বসে।

এই যে কথায় কথায় ধর্মীয় তালাকে এত দিনের সম্পর্কের সংসারের বাঁধন নিমেষেই ছিন্ন হয়ে যাওয়া, চতুর্থ বিয়ে করে সুন্নত দর্শন, তুকতাক, তাবিজকবচ, জলপড়া, তেলপড়া, ঝাড়ফুঁক চিকিৎসা ইত্যাদি নানা অন্ধ সংস্কার, কুসংস্কার এখনো গ্রামবাংলাজুড়ে চেপে বসে আছে। এসব অবৈজ্ঞানিক পন্থায় কত প্রাণ হারিয়ে গিয়েছে, আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কুসংস্কারজাত বিধানের বলি হতে হয়েছে ঘরের অবলা নারীকে। অসামান্য মুনশিয়ানায় পরিচালক এসব জীবন ছবিতে তুলে এনেছেন।

মন্তু আর টুনির ভাসা–ভাসা প্রেমই যদিও এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ছিল। যে প্রেম অতীব সুন্দর এবং চিরকালের মিলনহীন। দুজনের শাপলা তুলতে যাওয়া, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, রাতের অন্ধকারে মাছ ধরতে যাওয়া, ঘরে–বাইরে মান-অভিমান দৃশ্য পর্ব, খুনসুটি, টুনিকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য এক রাতের মধ্যে মন্তুর নৌকা সারাই করা; যদিও সে যাত্রায় সে যেতে পারেনি, কাজটা করতে পারবে না বলায় অভিমানী টুনি চলে গিয়েছিল আর মন্তুর ঘরের মধ্যে রেখে গিয়েছিল শাপলার মালা। বাপের বাড়ি থেকে টুনিকে আনতে গিয়ে সেখানে দুজনের হাসিখুশি জীবন, ফেরার পথে দীর্ঘ নৌকাভ্রমণ, মেলায় চুড়ি কিনে দেওয়া, যাত্রাপালা দেখা, মন্তু নতুন বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে ভেবে একজনের ঘরে আশ্রয় দিতে চাওয়ার আতিথেয়তা—এমনই গভীর প্রেম তাদের; অথচ নির্জন নৌকাভ্রমণের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সম্পর্কে বন্ধনে অটুট, এই প্রেম রাধা–কৃষ্ণের পরকীয়ার মতো নৌকাবিলাসে দৈহিক সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায় না।

সুচন্দার চরিত্র অনুযায়ী শিল্পী নির্বাচনও প্রশংসনীয়। মন্তু চরিত্রে রিয়াজ একেবারে গ্রাম্য চালচুলোহীন যুবকটি হয়ে উঠতে পেরেছে। টুনি চরিত্রে নবাগতা শারমিন জোহা শশী নিজের শিল্পীসত্তার প্রমাণ রেখেছেন। বড় কোনো তারকা অভিনেত্রী না রেখেও একজন সফল নায়িকার জন্ম দিয়েছেন পরিচালক। একটি চলচ্চিত্র যদি সার্বিক সফলতায় ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে, তার চরিত্র শিল্পী অভিনেতারাও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কে কতটা এগোতে পেরেছে, তা–ও বিচার্য নয়। টুনির মা চরিত্রে পরিচালক নিজে অভিনয় করেছেন। তিনি যে প্রবাদপ্রতিম শিল্পী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস তা জানে। বড় শিল্পী আংশিক অভিনয়েও দাগ রেখে যেতে পারেন। মকবুল শিকদার চরিত্রে এ টি এম শামসুজ্জামান অনন্য। সব অভিনেতা শিল্পীরাই এই চলচ্চিত্রের সম্পদ।

সংগীত হলো এই চলচ্চিত্রের আরও মূল্যবান সম্পদ। ‘আশা ছিল মনে মনে প্রেম করিমু তোমার সনে/ তোমায় নিয়া ঘর বান্দিমু গহিন বালুর চরে গো...’ সুবীর নন্দীর কণ্ঠে এই গান হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গানটি লিখেছেন জহির রায়হান নিজে। এই চলচ্চিত্রে আরও বেশ কয়েকটি গান তাঁর লেখা। কিছু কথার অংশ গাজী মাজহারুল আনোয়ার একটু সাজিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় ‘তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি তোমার মন/ আমি জীবন বেঁধেছি মরণ বেঁধেছি ভালোবেসে সারাক্ষণ’ গানটিও খুবই সুন্দর। এই গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সুবীর নন্দী ও অনুপমা মুক্তি। অন্য গানগুলোও ভালো লাগে। সংগীত পরিচালনা করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গ্রামীণ পুঁথি পাঠ, লোকগানের আসর ভালো লাগে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে বংশপরম্পরায় এখানে তুলে আনা হয়েছে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র মানেই সংগীত নিয়েও গবেষণা। রচনার মধ্যেও সেই চিরন্তনী গবেষণার সুর বহমান। পরিচালক সুচন্দাও সেই ধারা ধরে রেখেছেন। চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান। সম্পাদনা করেছেন মজিবুর রহমান দুলু।