মাথিনের কূপ এক ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতিচিহ্ন

মাথিনের কূপের সামনে লেখক

ঘুরে এলাম টেকনাফ থানার অভ্যন্তরে অবস্থিত মাথিনের কূপ থেকে। যে কূপ আজও টেকনাফ থানার সাবেক পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্য এবং মগ রাজকন্যা মাথিনের এক ব্যর্থ প্রেমের হৃদয়বিদারক উপাখ্যান হিসেবে লোকমুখে প্রচলিত। টেকনাফে ঘুরতে এলেও পর্যটকেরা এই মাথিনের কূপে এসে নিজেদের প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করে থাকেন। যদিও এই কূপে এখন পানি নেই এবং কূপের মুখ জাল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। তবু এই কূপ লাইলি-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, শিরি-ফরহাদ, রাধা–কৃষ্ণের মতো এই বাংলাদেশের বুকে প্রেমের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উজ্জ্বল থাকবে যুগের পর যুগ। এই কূপের পাশে ধীরাজের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপিত আছে।

ধীরাজ ভট্টাচার্য উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের এক নক্ষত্রের নাম। দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি জননন্দিত। ধীরাজ–মাথিনের প্রেমকাহিনি বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সংযোজন। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ জনপদের অধিবাসীদের নিকট তাঁদের নাম এখনো ভাস্বর। মাথিনের স্মৃতিবিজড়িত পাতকুয়া বর্তমানে ‘মাথিনের কূপ’ নামে পরিচিত। এই অমর প্রেমকাহিনি নিয়ে লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘যখন পুলিশ ছিলাম’। সাহিত্যের গুণগত মানের জন্য যা উপন্যাস নামেও অধিক পরিচিত। লেখক বইটি তাঁর পিতাকে উৎসর্গ করেছেন এবং পিতা তাঁকে জোর করে পুলিশের চাকরিতে ঢুকিয়েছেন বলে লেখক নিজেকে ভাগ্যবান বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বইয়ের বিভিন্ন স্থানে জোর করে পুলিশে ঢোকানোয় পিতার প্রতি অভিমানও প্রকাশ পেয়েছে।
‘সতীলক্ষ্মী’ ছবিতে একটি খল চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ধীরাজের বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তখনকার দিনে ভদ্রঘরের কোনো ছেলের সিনেমায় অভিনয় করা ভালো চোখে দেখা হতো না। আত্মীয়মহলে নিন্দা–সমালোচনা শুরু হলে ধীরাজের পিতা তাঁকে পুলিশের চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন।

ধীরাজের প্রথম পোস্টিং পুলিশের আইবিতে ডিটেকটিভ পদে; যে বিভাগের প্রধান কাজ ছিল স্বদেশি আন্দোলনের নেতাদের ওপর নজর রাখা। ইংরেজ শাসনামলে যখন স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার বইতে শুরু করে, সে সময় জাতির সূর্যসন্তানদের প্রতি এই অনুচরবৃত্তির কাজ সমাজে ছিল গর্হিত ও ঘৃণ্য। ধীরাজ প্রমোশনের আশায় অনেক স্বদেশিকে ধরার অভিযানে অংশ নেন; কিন্তু সফল হননি। তবে এখানে কিছু স্পষ্ট ঘটনা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। সে সময় অনেক স্বদেশি নেতা ইংরেজদের গোয়েন্দা হয়ে কাজ করতেন, এসব তথাকথিত নেতা জেল খাটতেন, খদ্দর পরতেন, বাংলা মায়ের বন্ধন–দশা ঘোচানোর জন্য টংয়ে কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ করতেন আবার নিজেদের সব সংবাদ সরবরাহ করতেন পুলিশের আইবি অফিসে। ব্রিটিশ সরকারের টাকায় বহাল তবিয়তে থাকতেন এসব তথাকথিত নেতা।

সারদায় ট্রেনিং শেষে তাঁর পোস্টিং হয় চট্টগ্রামে। ধীরাজের গান ও আবৃত্তির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে এসপি মি. মুলান্ডের স্ত্রী তাঁর সঙ্গে ভাব জমাতে চান। এতে পরকীয়া সন্দেহে এসপি সাহেব ধীরাজকে টেকনাফ থানায় বদলি করে দেন। সে সময় দাগী আসামি ও শাস্তিপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের এই দুর্গম এলাকায় পাঠানো হতো।

ধীরাজ গিয়ে দেখেন, টেকনাফ হলো মগ–অধ্যুষিত এলাকা। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত, তবে আবহাওয়া স্বাস্থ্যকর ও জিনিসপত্রের দাম কম। পুলিশ অফিসাররা নিজেদের মনমতো আইন চালু করে মগদের শাসন করত, মগের মুল্লুক যাকে বলে। ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইয়ে মগদের জীবনযাত্রা, ঘরবাড়ি, পোশাক, ভাষা, খাদ্যভ্যাস, ধর্ম, উৎসব প্রভৃতির বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। টেকনাফ থানার পাশে যে একটিমাত্র পাতকূয়া আছে, সেখানে নারীরা খাবার পানি সংগ্রহ করতে আসত। ধীরাজের কোয়ার্টার থেকে মেয়েদের পানি তোলার এই দৃশ্য দেখা যেত। মগ রাজকন্যা মাথিনও পানি তুলতে সেখানে আসতেন। ধীরাজ একপর্যায়ে মাথিনের প্রেমে পড়ে যান। পুলিশ কনস্টেবল হরকিই ছিলেন উভয় পক্ষের বার্তাবাহক। কারণ, হরকি বাংলা ও মগী উভয় ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। মাথিনও ধীরাজকে ভালোবেসে ফেলেন। ঠিক হয়, চৈত্রসংক্রান্তির দিন জাদিমুরা বৌদ্ধ মন্দিরে মগরীতি অনুসারে ধীরাজ মাথিনকে প্রেম নিবেদন করবেন এবং বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু হঠাৎ করে অফিসার ইনচার্জ মহেন্দ্র বড়ুয়ার নির্দেশে ধীরাজকে মজিদ সাহেবের সঙ্গে মারিওলা গ্রামে যেতে হয়। অভিযোগ আসে, সেখানখার অধিবাসীরা সমুদ্রের জল জ্বাল দিয়ে লবণ তৈরি করে তা বিক্রি করে আবগারি অফিসে। স্টিমারে করে নাফ নদী পার হয়ে হ্নীলা, তারপর সেখান থেকে চার দিন বনের মধ্য দিয়ে হেঁটে তবে মারিওলা গ্রামে যেতে হয়। ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ গ্রন্থে টানা চার দিন হেঁটে হিংস্র শ্বাপদসংকুল দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল পাড়ি দেওয়ার অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি লেখক সুন্দর নাটকীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে স্টিমারে চড়ে টেকনাফ আসার ভ্রমণকাহিনিও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেন। বিদেশে অল্প সময়ে কারও সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হওয়ার কথাও তিনি লিখতে ভোলেননি।

ধীরাজ ফিরে আসতে আসতে চৈত্রসংক্রান্তি পার হয়ে যায়। এসে দেখেন, তাঁর পিতা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে লিখেছেন, বাঙালি ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে মগ মেয়েকে বিয়ে করলে ধরে নেবেন, তাঁর ছেলে মরে গেছে। পিতৃ–আজ্ঞা পালন করতে সে রাতেই ধীরাজ টেকনাফ থেকে পালিয়ে যান, পরবর্তী সময়ে পুলিশের চাকরিও ছেড়ে দেন। ধীরাজের টেকনাফ ত্যাগের পর রাজকুমারী মাথিন অন্নজল ত্যাগ করে একপর্যায়ে মারা যান। হরকি ওদের সম্পর্কের মাধ্যম, এটা জানার পর মাথিনের বাবা মগ রাজা ওয়াংথিন হরকিকে মেরে আধমরা করে ফেলেন। ধীরাজের ভীরুতা ও কাপুরুষতার জন্য দুটি জীবন নষ্ট হয়ে গেল। জাতপাত, ধর্মীয় সংকীর্ণতার বলি হলো দুটি জীবনের ভালোবাসার অধ্যায়। পরবর্তীকালে ধীরাজ ভট্টাচার্য নায়ক হিসেবে খ্যাতিলাভ করলে ধীরাজের বিপরীতে যখন যে অভিনেত্রী অভিনয় করতেন, তাঁর মধ্যেই দর্শক মাথিনকে খুঁজে পেতেন।

বন্ধু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা