টরন্টো শহরের শীতের আলাদা এক ভাষা আছে।
সেই ভাষা শব্দে নয়, তুষারে লেখা। জানালার ওপারে নিরবচ্ছিন্ন সাদা ঝরনা নেমে আসে, রাস্তার আলো কুয়াশা আর বরফের ভেতর ম্লান হয়ে যায়, আর মানুষ বুঝতে শেখে, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর নীরবতাও কখনো কখনো খুব জোরে কথা বলে।
সেদিনও তেমনই এক সন্ধ্যা।
বাইরে মাইনাস দশ ডিগ্রি। ফায়ারপ্লেসে জ্বলতে থাকা আগুনের লালচে আলো ঘরের দেয়ালে ছায়া এঁকে দিচ্ছিল। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। আমরা তিনজন বসে গল্প করছিলাম।
সায়েম ভাই, আমাদের কোম্পানির সিনিয়র লিড ইঞ্জিনিয়ার। প্রবাসে এসে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়, যাদের ঘরে ঢুকলেই মনে হয় বহুদিন পর নিজের বাড়িতে ফিরেছি। ভাবিও ঠিক তেমনই। তার আন্তরিকতা কখনো অতিথিপরায়ণতা বলে মনে হয় না; মনে হয় বড় বোনের মমতা।
কফির কাপ নামিয়ে ভাবি হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন।
—নীল, একটা কথা বলব?
মৃদু হেসে বললাম,
—বলুন, ভাবি।
—রাগ করবে না তো?
—আপনার ওপর রাগ করার সাহস আমার নেই।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—এত বছর হয়ে গেল। ক্যারিয়ার হয়েছে, নিজের অবস্থান হয়েছে। কিন্তু নিজের জন্য কী করলে? একা একা আর কত দিন? বিয়ে করার কথা কখনো ভাবো না?
আমি হেসে বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইলাম।
—সবাইকে দিয়ে সবকিছু হয় নাকি, ভাবি?
সায়েম ভাই চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
—তোমার এই কথাটাই আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়। সারা দিন অফিসে তোমাকে দেখি। কাজে মন, বইয়ে মন, গিটার বাজাও, ভ্রমণ করো। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, জীবন একেবারে গুছিয়ে নিয়েছ। অথচ দিনের শেষে তুমি একাই ফিরে যাও।
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
—কখনো কি কাউকে ভালোবেসেছিলে?
ঘরটা হঠাৎ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ফায়ারপ্লেসের কাঠে আগুন ফেটে ছোট্ট একটা শব্দ হলো।
আমি উত্তর দিলাম না।
জানালার ওপারে তাকিয়ে রইলাম। সাদা তুষারের ভেতর হঠাৎ ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো আরেকটা আকাশ। অনেক দূরের একটা বিকেল। আমি ধীরে বললাম,
—মানুষ কখনো কখনো একটা গল্প কাউকে বলে না। কারণ, গল্পটা বললে সে আবার সেই সময়ে ফিরে যায়।
ভাবি মৃদুস্বরে বললেন,
—আজ ফিরে যাও। আমরা শুনব।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কফির মগটা টেবিলে রেখে বললাম,
—জানেন ভাবি, পৃথিবীর সব ভালোবাসা মিলনের গল্প নয়। কিছু ভালোবাসা শুধু নীরবে মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে। কারও কাছে কোনো দাবি করে না, কোনো অধিকারও চায় না। শুধু মানুষটাকে সারা জীবন বদলে দেয়। আমার গল্পটাও তেমন।
আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগের কথা। তখন ঢাকার উত্তরায় থাকতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। বাবার পক্ষে নিয়মিত টাকা পাঠানো সম্ভব হতো না। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা, বাসাভাড়া আর খরচ চালাতাম। উত্তরার একটা পুরোনো বাড়ির চিলেকোঠার ছোট্ট ঘর ছিল আমার ঠিকানা। ঘরটা বড় ছিল না। একটা খাট, একটা পড়ার টেবিল, বইয়ের তাক আর জানালার পাশে রাখা পুরোনো একটা গিটার। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল ছাদ।
সন্ধ্যা নামার আগে পড়ন্ত রোদ যখন আকাশজুড়ে লালচে রং ছড়িয়ে দিত, আমি গিটার হাতে ছাদে উঠে যেতাম। কখনো বাজাতাম। কখনো বই পড়তাম। কখনো কিছুই করতাম না। শুধু আকাশ দেখতাম। হয়তো মানুষ একা থাকলে আকাশের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
ঠিক এমনই এক বিকেলে প্রথম তাকে দেখি। আমাদের পাশের ছয়তলা বাড়ির একটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। অদ্ভুত শান্ত একটি মেয়ে। তার হাতে কোনো মোবাইল ছিল না। কোনো বইও নয়। সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাতাসে তার চুল উড়ছিল।
কিন্তু আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল তার চোখ। কিছু কিছু চোখ থাকে, যেগুলোকে সুন্দর বলা যায় না। কারণ, সুন্দর শব্দটা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।
সেই চোখ দুটো যেন নিজের ভেতর একটা বিকেল লুকিয়ে রেখেছিল। আমি তার নাম জানতাম না। কখনো জানার চেষ্টাও করিনি। নিজের মনেই একটা নাম দিয়েছিলাম—‘সুনয়না’।
নামটা শুধু আমার ছিল। আমার কল্পনার। আমার নীরবতার। তার বাস্তব নাম কী ছিল, তখনো জানতাম না।
তার পর থেকে প্রতিদিন বিকেলে আমি অপেক্ষায় থাকতাম। ছাদে উঠতাম। আর কিছুক্ষণ পর সে এসে দাঁড়াত সেই বারান্দায়।
আমাদের মধ্যে কখনো কথা হয়নি। চোখাচোখিও খুব কম। তবু মনে হতো, বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে দুজনের জীবন অদৃশ্য কোনো সেতুতে এসে মিলেছে।
কখনো তাকে অনুসরণ করিনি। তার সম্পর্কে খোঁজ নিইনি। কারণ, দূরত্বেরও একটা সৌন্দর্য আছে। সব মানুষকে কাছে গিয়েই জানতে হয় না। কিছু মানুষ দূর থেকেই হৃদয়ের ভেতর জায়গা করে নেয়।
এভাবেই কেটে গেল কয়েক মাস। একদিন বিকেলে ছাদে উঠে দেখলাম, বারান্দাটা ফাঁকা। ভাবলাম, হয়তো কোথাও গেছে।
পরদিনও এল না।
তারপর আরও এক দিন।
এক সপ্তাহ।
এক মাস।
ঋতু বদলে গেল।
আকাশের রং বদলে গেল। কিন্তু সেই বারান্দায় আর কাউকে দেখা গেল না। বুঝলাম, কিছু অপেক্ষার কোনো উত্তর হয় না।
তারপর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ এসে গেল। পড়াশোনা, প্রজেক্ট, ইন্টারভিউ—জীবন অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করল। তবু মাঝেমধ্যে বিকেলের আকাশ দেখলে মনে হতো, কোথাও যেন একটা বারান্দা এখনো খালি দাঁড়িয়ে আছে। আর সেখানে কেউ একজন আর কখনো ফিরে আসবে না।
অফিসে যোগ দেওয়ার তিন সপ্তাহের মাথায় প্রথমবার তার সঙ্গে কথা হলো।
সেদিন দুপুরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। কাচঘেরা অফিসের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো লম্বা দাগ টেনে নিচে নেমে আসছিল। ক্যাফেটেরিয়ায় বসে এক কাপ কফি হাতে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ পাশে এসে কেউ বলল,
—এই সিটটা খালি?
মুখ তুলে তাকাতেই বুকের ভেতরটা অকারণ ধক করে উঠল।
সে।
উত্তরার সেই বারান্দার মেয়েটি।
আমি সামান্য হাসলাম।
—অবশ্যই।
সে বসে কফির কাপ নামিয়ে বলল,
—আমি নতুন। এখনো কাউকে তেমন চিনি না।
—আমিও খুব পুরোনো নই।
সেদিনের কথোপকথন ছিল খুব সাধারণ। অফিস, কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার যানজট; এর বেশি কিছু নয়। আশ্চর্যের বিষয়, কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলতে কোনো আয়োজন লাগে না। যেন বহুদিনের চেনা।
তার নাম জানলাম, সুস্মিতা।
আমি নামটা মনে রাখলাম। তবু নিজের ভেতরে সে রয়ে গেল অন্য নামে—‘সুনয়না’।
এরপর ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়ল।
অফিস শেষে মাঝেমধ্যে সবাই মিলে চা খেতে যেতাম। কোনো প্রজেক্ট শেষ হলে পুরো টিম রাত পর্যন্ত কাজ করত। সেই সব দীর্ঘ সন্ধ্যায় সুস্মিতাকে নতুন করে চিনতে শুরু করলাম।
সে খুব কম কথা বলত। অকারণ হাসত না। তবে কেউ সমস্যায় পড়লে সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত।
একদিন জানতে পারলাম, সে রবীন্দ্রসংগীত শেখে।
আরেক দিন শুনলাম, অবসরে জলরঙে ছবি আঁকে।
আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, মানুষকে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্য দেখা যায়; কাছে এলে দেখা যায় তার নীরবতা। আর নীরবতাই একজন মানুষকে সবচেয়ে আলাদা করে।
সেদিন অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃষ্টি থেমেছে। রাস্তার বাতিগুলো ভেজা ডামারের ওপর হলুদ আলো ফেলছে। আমি বললাম,
—কফি খাবেন?
সে একটু ভেবে মৃদু হেসে বলল,
—আজ খাওয়া যেতে পারে।
ছোট্ট একটি ক্যাফেতে আমরা জানালার পাশে বসলাম। বাইরে গাড়ির আলো ভেজা রাস্তায় ভেঙে পড়ছিল।
অনেকক্ষণ গল্প হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি, বই, সিনেমা, ভ্রমণ, প্রিয় ঋতু। কথার ফাঁকে হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি এত চুপচাপ কেন?
আমি হেসে বললাম,
—সবাই সব কথা বলতে পারে না।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—আমার মনে হয়, যারা কম কথা বলে, তাদের ভেতরে অনেক গল্প জমে থাকে।
আমি উত্তর দিলাম না। সত্যিই আমার ভেতরে একটি গল্প ছিল। যার শুরু হয়েছিল উত্তরার এক ছাদের বিকেলে।
বহুবার ভেবেছি, আজ বলব। বলব, কয়েক বছর আগে প্রতিদিন বিকেলে আমি এক অচেনা মেয়েকে আকাশ দেখতে দেখতাম। বলব, তার জন্যই আমি সন্ধ্যার অপেক্ষা করতাম। বলব, তাকে না জেনেই একটা নাম দিয়েছিলাম।
কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সত্যি কথাটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। আমি পারলাম না। শুধু কফির কাপে আঙুল ঘুরিয়ে যেতে লাগলাম।
ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার মুখে খুব কোমল একটা হাসি ফুটে উঠল। সে ফোন ধরল। নরম গলায় বলল,
—হ্যাঁ... আমি বের হচ্ছি... আর পাঁচ মিনিট।
ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমাকে উঠতে হবে।
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
ক্যাফের দরজার বাইরে এসে দেখি, একটা গাড়ি ধীরে ধীরে এসে থামল। গাড়ি থেকে একজন নেমে ছাতা খুলে তার দিকে এগিয়ে এল। সুস্মিতার মুখে যে হাসি ফুটে উঠল, তাতে কোনো দ্বিধা ছিল না, কোনো অভিনয়ও নয়। সে মানুষটিকে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখল, যেমন মানুষ নিজের আপনজনকে দেখে। বিদায় নেওয়ার আগে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কাল দেখা হবে।
আমি বললাম,
—ভালো থাকবেন।
গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
আমি অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলাম। বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। ভেজা শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, কিছু স্বপ্ন ভাঙার শব্দ বাইরে শোনা যায় না। সেগুলো শুধু মানুষের ভেতরেই প্রতিধ্বনি তোলে।
সেদিন রাতেই প্রথম বুঝেছিলাম, ভালোবাসা সব সময় কাউকে পাওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো সময়মতো কিছু না বলার নামও ভালোবাসা।
পরদিন অফিসে গিয়ে সুস্মিতাকে দেখলাম না। ভাবলাম, হয়তো ছুটিতে আছে।
পরদিনও এল না।
এরপর আরও কয়েক দিন কেটে গেল।
কাজের ব্যস্ততা আমাকে ডেস্কে আটকে রাখলেও মনটা বারবার করিডরের দিকে চলে যেত। এক বিকেলে সাহস করে মানবসম্পদ বিভাগের এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম,
—সুস্মিতা কি ছুটিতে?
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—জানেন না? ওর স্বামীকে সিঙ্গাপুরে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। তাড়াহুড়ো করেই ও চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। যাওয়ার আগেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। আপনি সেদিন ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে ছিলেন, তাই হয়তো দেখা হয়নি।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতর কোনো বিস্ফোরণ ঘটল না। শুধু একটা নিঃশব্দ শূন্যতা নেমে এল, যেন বহু বছর আগে উত্তরার সেই বারান্দাটা আবার একবার খালি হয়ে গেল।
এরপর জীবন খুব দ্রুত বদলে গেল। কাজের চাপ বাড়ল। পদোন্নতি হলো। নতুন শহর, নতুন দায়িত্ব, নতুন দেশ। একসময় কানাডার একটা সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। বন্ধুরা বলেছিল,
—স্বপ্নপূরণ হয়ে গেল!
হয়তো সত্যিই হয়েছিল। কিন্তু মানুষ বুঝতে শেখে, সব স্বপ্নের সঙ্গে সব আনন্দ আসে না। কিছু সাফল্য খুব নিঃসঙ্গও হয়।
টরন্টোতে আসার পর প্রথম শীতেই আমি বুঝলাম, তুষার শুধু শহর ঢেকে দেয় না, মানুষের স্মৃতিকেও সাদা করে দিতে চায়। কিন্তু সব স্মৃতি ঢেকে যায় না। কখনো কখনো কোনো কফির গন্ধ, কোনো বিকেলের আলো কিংবা কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষের ছায়া হঠাৎ বহু বছর আগের দরজা খুলে দেয়। সেই দরজার ওপাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে উত্তরার সেই বিকেল।
আর একটি নাম, যে নাম পৃথিবীর কেউ জানত না। শুধু আমি।
সুনয়না।’
ফায়ারপ্লেসের আগুন তখন ধীরে ধীরে নিভে আসছে। কথা শেষ করতেই ঘরজুড়ে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। ভাবি কফির ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সায়েম ভাই উঠে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তাহলে তুমি তাকে কোনো দিন জানাওনি?
আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়ালাম।
—না।
—আফসোস হয় না?
জানালার বাইরে তাকালাম। তুষার পড়ছে। প্রতিটি সাদা কণা নিঃশব্দে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। আমি ধীরে বললাম,
—আফসোস হয় সেই ভালোবাসার জন্য, যেটা কাউকে কষ্ট দিয়ে নিজের করতে হয়। আমার গল্পে তেমন কিছু ছিল না। সে তার জীবন নিয়ে সুখী ছিল। আমি কেন আমার অনুভূতির ভার তার কাঁধে চাপিয়ে দিতাম?
ভাবি খুব আস্তে বললেন,
—কিন্তু তুমি তো একা রয়ে গেলে।
আমি হেসে উত্তর দিলাম,
—মানুষ সব সময় কারও অভাবে একা থাকে না। কখনো কখনো একটি সুন্দর স্মৃতির সঙ্গেও সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত বারোটা ছুঁয়েছে। বাইরে তুষারপাত আরও ঘন হয়েছে। বিদায় নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই সায়েম ভাই আমার কাঁধে হাত রাখলেন।
—নীল...
—জি?
—জীবনে যদি আবার কোনো বিকেল এসে দাঁড়ায়, এবার যেন চুপ করে থেকো না।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু মৃদু হাসলাম।
বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির জানালার বাইরে অসংখ্য তুষারকণা উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হলো, মানুষ আসলে কাউকে ভুলে যায় না। সে শুধু স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যায়।
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে বহুদিন পর জানালার পাশে দাঁড়ালাম। দূরে বরফে ঢাকা শহর ঘুমিয়ে আছে।
অন্ধকার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে মনে হলো, সময় আমার চুলে রুপালি রং ছড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু উত্তরার সেই একফালি আকাশ এখনো কোথাও রয়ে গেছে।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় আবার একটি বারান্দা ভেসে উঠল। সেখানে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ আজও স্পষ্ট নয়। শুধু চোখ দুটো স্পষ্ট। আমি নিঃশব্দে বললাম,
—ভালো থেকো, সুনয়না।
জানালার ওপারে তুষার পড়তেই থাকল। আর আমি বুঝলাম, কিছু ভালোবাসার শেষ অধ্যায় মিলনে লেখা হয় না। সেগুলো লেখা থাকে নীরবতায়।
উত্তরা, ঢাকা