আলগোছে চলা বেখেয়ালি মেঘের আনাগোনা, কখনোবা অবাধ্য একরোখা ঝোড়ো বৃষ্টি, কিংবা হঠাৎ নাগাল পাওয়া সুখের মতো সূর্যের মুখদর্শনে চলতে থাকে শ্রাবণের রহস্যঘেরা ইন্দ্রজাল।
বিগত হিমসন্ধ্যায় আগন্তুকের মতো, প্রসাধনীর পরত ছাপিয়ে নাগরিক জীবনের ক্লান্তির স্পষ্টতা মেখে যে মেয়েটি মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অচেনা-অজানা এক পাত্রের সম্মুখ-স্বরূপে, দিনান্তে সে পরিচয় অর্ধবছরের পঞ্জিকাকুণ্ডলী পেরিয়ে শ্রাবণের হালখাতা খুলে বসেছে আজ।
সেদিনের সেই প্রথম দেখা চোখজোড়ার মধ্যে ছিল অস্বস্তির জলছাপে আঁকা নীরবতা; ছিল কিছু আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন আর অপরিচিত এক শীতল দেয়াল। কখন যে সময়ের স্রোতে অগোচরে-নীরবে সম্পর্কের চোরাবালিতে হারিয়েছে সে দেয়াল, তার হিসাব রাখিনি আমরা দুজন, হিসাব রাখেনি সেদিনের হিমজড়ানো সন্ধ্যাতারা কিংবা ব্যস্ততম শহরের আলোকসজ্জাও।
পৌষের হিমজড়ানো সন্ধ্যায় হৃৎকলমে অনুভূতির আখরে শুরু হয়েছিল যে উপন্যাসের পথচলা, আজ তার পরতে পরতে টক-মিষ্টি-ঝালের রসদে ভরা সম্পর্কের গল্প। তার প্রতিটা শব্দ কিংবা বাক্যের মায়াজালে লুকিয়ে আছে অভিমানের আঁচ, কোথাও অনুচ্চারিত মায়া; কোথাও নিঃশব্দ অপেক্ষা, আবার কোথাও অকারণ হাসির ছোট্ট কোনো উপলক্ষ!
দিনক্ষণ ঠাহর করতে না পারলেও প্রথম পরিচয়ের সেই আনুষ্ঠানিকতা কবে যে আপন হয়ে ওঠার নির্ভার অধিকারে বদলে গেল, বুঝিনি! কবে যে ‘আপনিটা’ ‘তুমি’তে বদলে গেল, কবে থেকে যে কথার ফাঁকে ফাঁকে জমে উঠল অদৃশ্য এক নির্ভরতার সেতু—দিনপঞ্জির কোনো হিসাব রাখিনি।
শুধু এইটুকুন স্মৃতিকোণে উঁকি দেয়, নাম না–জানা বিকেলের অচেনা নরম আলোয় কথার ভাঁজে ভাঁজে যে মেয়েটি রিকশায় আমার বাঁ পাশে বসতে চেয়েছিল, সে-ই আজ অর্ধাঙ্গী হওয়ার প্রহর গুনছে অহর্নিশ।
শ্রাবণের ভাবালুতা মাখা, মেঘমেদুর চাদরে মোড়া কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে সোঁদামাটির ঘ্রাণ গায়ে জড়িয়ে, কাকভেজা শরীরে সামনে দাঁড়াতেই মেয়েটা বাঁকা চাঁদের মতো প্রশ্ন চোখেমুখে মেখে বলে, শ্রাবণের প্রথম দোলনচাঁপা কই!
প্রেমিকের কাছে শ্রাবণের উপহারস্বরূপ কদমফুল চাইতে শুনলেও দোলনচাঁপা চাওয়ার ব্যাপারটা আমাকে রীতিমতো অপ্রস্তুত করে তোলে!
ইট-পাথরের শহরে কোথায় দোলনচাঁপা পাওয়া যায়, আমার জানা নেই। তাই জোরগলায় এমন ভুল দ্বিতীয়বার না হওয়ার কথাও দিতে পারছিলাম না! মেয়েটার এহেন শিশুসুলভ আবদারে প্রায়ই তব্ধা খেতে হয় আমাকে।
এ শহরের চলতি পথে ইট-পাথর, ধুলা-ধোঁয়া, বাস-ট্রাকের নাগরিক ব্যস্ততার ভিড়ে ফুলের দোকান, পুরোনো বাড়ির সীমানা, অচেনা গলির বাগানে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি শুভ্রকোমল তুলতুলে দোলনচাঁপা!
শত খুঁজেফিরে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী সাক্ষাতে তার সামনে হাজির হলাম একগুচ্ছ পদ্ম হাতে।
তবে সেই পদ্মগোছায়ও ছিল যান্ত্রিকতার ছাপ! এ শহরের ফুল বিক্রেতাগুলো বড্ড বেরসিক। পদ্মের পাপড়িগুলোকে তারা বিশেষ কৌশলে আধভাঙা করে, কৃত্রিম রঙে রাঙিয়ে বিক্রয়যোগ্য করে তোলে বটে; তবে তাতে আর বোঝার উপায় থাকে না আদৌ এটা পদ্ম নাকি ভিনদেশি নাম না–জানা অন্য কোনো ফুল!
শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টিস্নাত দোলনচাঁপা হাতে উপস্থিত হতে না পারার তীব্র অপরাধবোধ ঢাকতে রসিকতার স্বরে তাকে বললাম, হতে পারে পদ্মের গায়ে দেওয়া রং কৃত্রিম; কিন্তু হলফ করে বলতে পারি—এ পদ্ম কৃত্রিমতাবিহীন ভালোবাসামাখা!
মুচকি হেসে মেয়েটা বলে, দোলনচাঁপা তো শুধু অপেক্ষার অজুহাতমাত্র। এ অপেক্ষা গোটা একটা ঋতুর অপেক্ষা!
এ শ্রাবণ না হোক, পরের শ্রাবণও নাহয় অপেক্ষায় থাকব তোমার দোলনচাঁপার।
সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা