‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’কে মনে করিয়ে দেয়

সফল চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। ছবিটি ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায়

আবু ইসহাকের কালজয়ী উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’কে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন নিয়ামত আলী এবং মসিহউদ্দিন শাকের। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের যদি তালিকা তৈরি করা হয়, একেবারে প্রথম সারিতে প্রথম দিকে থাকবে এই সাহিত্যজাত চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে যদিও কোথাও কোথাও উপন্যাসের পাতা হুবহু উঠে আসেনি। কিন্তু উপন্যাস তো আমরা পড়ে নিতে পারি। চলচ্চিত্র মাধ্যমের নান্দনিকতা, দৃশ্যায়ন যেসব কারণে বোধের ভেতর আরও সূক্ষ্মতর বোধ আমাদের ভেতর জাগাতে সক্ষম হয়, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্র হিসেবে একেবারে যথাযথ, অনন্য, ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করে।

বঙ্গদেশের জনজীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, ভয়ানক দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, নবগঠিত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। আর সূর্য দীঘল বাড়ি হলো পূর্ব–পশ্চিমবিস্তারী পরিত্যক্ত ভিটে বা বাড়ি। গ্রামীণ লোকের বিশ্বাস, এই ভিটেতে জিনেদের বসতি, কোনো মানুষ বাস করলে তাঁর বংশে বাতি জ্বালানোর মতো কেউ থাকে না।

অথচ চলচ্চিত্রের শুরুতে জয়গুনকে আমরা দেখেছি, পুত্র–কন্যা নিয়ে শহরের লঙ্গরখানা থেকে ফিরে এসে, তেমনই একটা ভিটেয় নতুন করে আস্তানা গড়ার চেষ্টা করছে। শহরে গিয়েছিল খেয়ে–পরে বেঁচে থাকার আশায়। কিন্তু দুর্ভিক্ষের দিনে শহরে একশ্রেণির মানুষের কাছে প্রচুর খাবার মজুত থাকলেও, মনের আত্মকেন্দ্রিক দুর্ভিক্ষ কখনোই মোছার নয়। জয়গুনকে তাই আবার গ্রামে ফিরে আসতে হয়।

গ্রামের হতদরিদ্র কন্যা জয়গুনের অল্প বয়সে প্রথম বিয়ে হয়েছিল জব্বার মুন্সীর সঙ্গে। জব্বার মারা যাওয়ার পর করিম বকশের সঙ্গে নতুন করে সংসার পাতে। করিমও একদিন পুত্র–কন্যাসমেত তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। জয়গুনের সঙ্গে এখন নতুন করে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে জব্বার মুন্সীর সন্তান হাসু, করিম বকশের মেয়ে মায়মুন, মৃত ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান। করিম বকশের ঘরে জয়গুনের আরও একটি শিশুসন্তান রয়েছে—কাসু। করিম পুনরায় বিয়ে করে কাসুকে নিজের কাছে রেখে দেয়। মায়ের কাছে যেতে দেয় না। দাদা হাসু লুকিয়ে–চুরিয়ে কতভাবে কাসুর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে, কাসুর জন্য ডিম বিক্রি করা টাকায় খেলনা ঘূর্ণি, সন্দেশ কিনে নিয়ে যায়। করিম দেখতে পেলে হাসুকে তাড়া করে। কাসুকে ধরে মারে।

লড়াকু জয়গুন লোকের বাড়িতে ঝিগিরি করে, ঘুরে ঘুরে চাল বিক্রি করে, ধানকলে চাল ঝাড়ার কাজ নেয়। আত্মসম্মান বজায় রেখে এক নারী পুত্র–কন্যাসমেত কীভাবে লড়াই করে বেঁচে থাকে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জয়গুন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লোভী পুরুষের চক্রান্ত তাকে ঘিরে ঘিরে থাকে। বাড়িতে জিন তাড়ানোর নাম করে যে ফকির আসে, সেই ফকির বৃষ্টির রাতে পান খাওয়ার নাম করে ঘরে ঢুকে জয়গুনের শরীরে হাত দিতে চায়। গ্রামের মোড়ল জয়গুনকে বিয়ে করতে চায়। জয়গুন রাজি না হলে, ধর্মের দোহাই দিয়ে পর্দাহীন নারীর ঘুরে ঘুরে কাজ করা বন্ধ করতে চায়। জয়গুনের কন্যা মায়মুনের বিয়েতে মোড়ল এসে মৌলবিকে দিয়ে জয়গুনকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয় যে সে আর কখনো গ্রামের বাইরে যাবে না। মায়মুনের বিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে জয়গুন প্রতিজ্ঞা করে।

বিয়েতে পাত্রপক্ষ সাত-আটজনকে নিয়ে আসবে ভেবে রান্না হয়। অধিক লোকজন এসে পড়ায় গরিব পরিবার বরকত করতে তরকারিতে জল দেয়। অথচ বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই মায়মুনকে দাসী–বাঁদির মতো খাটিয়ে নিয়ে, পেট ভরে খেতে না দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ওপর বহুবিধ নির্মম অত্যাচারের সমাজবিশ্লেষণ এই চলচ্চিত্র।

মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে থাকে মমতাময়ী নারী জয়গুন। কাসু অসুস্থ হয়ে পড়লে করিমের বাড়িতে গিয়ে দিনের পর দিন শুশ্রুষা দিয়ে পেটের ছেলেকে সুস্থ করে তোলে। করিম আবার জয়গুনকে ঘরে তুলতে চায়। মোড়ল রোজ রাতে এসে জয়গুনের বাড়িতে ঢিল ছোড়ে। সেও জয়গুনকে যেকোনো প্রকারে পেতে চায়। এক রাতে ঢিল ছোড়ার সময় করিম মোড়লকে দেখে ফেলে। দুজনের মধ্যে লড়াইয়ে করিমকে গলা টিপে হত্যা করে মোড়ল। জয়গুন আড়াল থেকে সব দেখে ফেলে। পরদিন গ্রামের লোকের সামনে জিনে ধরে করিমকে মেরে ফেলেছে বলে প্রচার করতে চায় মোড়ল। জয়গুন আড়াল থেকে দেখে ফেলেছে জানার পর, রাতের অন্ধকারে আগুন লাগিয়ে তার ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সূর্য দীঘল বাড়ি, তালগাছের ভিটা এবার আবার শূন্য হয়ে যায়। দিকশূন্যপুরে জয়গুন আবার একা।

‘জয়গুন’ চরিত্রে ডলি আনোয়ারের অভিনয় ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রের সম্পদ। ভাবতেও কষ্ট হয় যে ব্যক্তিজীবনে অসামান্য সৃষ্টিশীল এই মানুষ একদিন আত্মহত্যা করে বিদায় নিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এই ক্ষতি পূরণের নয়। এই ছবির টুকরো টুকরো দৃশ্যের বুনন সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’কে মনে করিয়ে দেয়। রবিশংকরের আবহ সুরটুকু বাদ দিলে ‘পথের পাঁচালী’র সমতুল্য এই চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের সুরকার আলাউদ্দিন আলী, চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন। শফির মায়ের চরিত্রে রওশন জামিলের অভিনয় মনে রাখার মতো। হাসু চরিত্রে লেনিন, কাসু চরিত্রে সজীব, মায়মুন চরিত্রে ইলোরা গহরও মনে দাগ কাটেন।

১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। ১৯৪৩ সালের আকালের সময় থেকে ঘটনার বিবর্তন শুরু। মানুষের ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, ধর্মীয় কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান এই চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। রেলগাড়িতে হকারের পাকিস্তান বড়ি বিক্রি, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানে মুখর রাস্তা, হাসুর গাছে উঠে মায়ের ছেঁড়া শাড়ি কেটে সেলাই করে বানানো পাকিস্তানের পতাকা টাঙানো দেখে বোঝা যায়, দেশ ভাগ হয়ে গেছে। নবগঠিত পাকিস্তান সরকার বাঙালির জনজীবনেও প্রভাব ফেলেছে। যদিও এর পরবর্তী সময়ের ইতিহাস কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা সেদিনের বাঙালির জানা ছিল না। আবার নবগঠিত পাকিস্তান সরকার গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের জীবনে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনতে পারেনি, সেই ছবিও পরিষ্কার। দেশ ভেঙে দেশ গড়ে ওঠে, গরিবের জীবনসংগ্রাম চিরকালই একই রকম থাকে। নারীর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামও।

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত