ছোটভাই আনিসুলের হাঁটার ধরন একেবারেই আলাদা। পায়ের পাতাগুলো ভেতরের দিকে হালকা বাঁকিয়ে হাঁটে। মানে ডান পায়ের পাতা সামনের বামকোণে আর বাম পায়ের পাতা সামনের ডানকোণে বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে হাঁটে। পায়ের পাতাগুলো গোড়ালির অস্থিসন্ধির হাড়ের অবস্থাগত তারতম্যের জন্য ভেতরের দিকে ভাঁজ হয়ে থাকে। সে জন্য দেখতে অনেকটা গলফ খেলার স্টিক বা ক্লাবের মতো দেখায়। ইংরেজিতে এমন পা’কে ‘ক্লাব ফুট’ বলে। ক্লাব ফুট বাংলায় অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। আমাদের কুমিল্লায় বলে ‘কোল বেঙ্গুরা’। চাঁদপুরের অনেকে বলে ‘বেউরা’, আবার অন্যান্য জায়গায় ‘মুগুর পা’ও বলে থাকে।
বলছি ২০০৪ সালের কথা। সেসময় এই রোগের তেমন চিকিৎসাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ক্লাব ফুট সহজেই শনাক্ত এবং চিকিৎসা ফ্রিতেও করা হয়ে থাকে। ইংরেজিতে এই রোগটিকে কনজেনিটাল টেলিপেস ইকুইনো ভেরাস (সিটিইভি) বলে।
মুরুব্বিরা বলাবলি করে— ক্লাব ফুটে আক্রান্ত শিশুরা বড় হয়ে অনেক টাকার মালিক হয়। কথাটা সুসংবাদ নিশ্চিত। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত যে এমন ছেলেদের চাকরি বা বিয়ের ক্ষেত্রে ঝামেলা পোহাতে হয়। হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়।
ছোট ভাইটা মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করত যে অনেকের হাসতে হাসতে পেটব্যথা ধরে যেত। আমার অবশ্য বেশি হাসলে পেটব্যথা নয়, বরং গালব্যথা করে।
আনিসুল প্রায়ই এটা-ওটার আবদার করে। ভাইয়া আমার এটা লাগবে, ওটা লাগবে। এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দিতেই হবে। ওর এসব আবদার খুবই স্বাভাবিক। আমি মাঝেমধ্যে না করতাম। বলতাম, ‘এখনই তোকে এত এত কিছু দিয়ে যদি ফকির হয়ে যাই, ভবিষ্যতে কী হবে রে?’
‘ও ভাইজান, আপনার ভবিষ্যৎ আমার ওপর ছাইড়া দেন! জানেন না, আমি বড় হয়ে অনেক টাকার মালিক হব। তখন তো সব আপনার আর আমার। ও আম্মা গো, ভাইয়ারে কও টেনশনের কিছু নাই।’
কথা শুনে আম্মা হাসতেন, আমিও হাসতাম।
ছোট ভাইটা মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করত যে অনেকের হাসতে হাসতে পেটব্যথা ধরে যেত। আমার অবশ্য বেশি হাসলে পেটব্যথা নয়, বরং গালব্যথা করে।
একদিন বিকেলে মাদ্রাসা শেষে বাসায় ফিরে শুনি, সকাল থেকেই আনিসুলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়েছে, আর ফিরেনি। আব্বা-আম্মা হন্তদন্ত হয়ে এপাড়া–ওপাড়া চষে বেড়াচ্ছে। মেজ ভাই খুঁজতে বেরিয়েছে সাইকেল নিয়ে। ছোট চাচা এদিক-সেদিক লাগাতার ফোন করে যাচ্ছে। নানাবাড়ি থেকে মামা ছুটে এসেছে। ওর সমবয়সীরাও কেউ কোনো হদিস দিতে পারছে না। চাচি-আম্মারাও এদিক–সেদিক নজর রাখছে। বাড়ির প্রতিটা খাটের নিচ আর ধানের গোলাগুলোও বাদ যায়নি। না, কোথাও নেই সে।
মাদ্রাসাফেরত আমি, পেটে তখন প্রচুর ক্ষুধা। কিছু না খেয়ে আর বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দুপুরে হালকা নাশতা করেছি শুধু। বরুড়া থেকে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে হাঁপিয়ে গেছি অনেক। প্লেট তুলতে গিয়ে নজরে পড়ল ছোট ভাইটার ভাত খাওয়ার বিশেষ বাটিটা সেখানে নেই। সে সব সময় একই বাটিতে খাবার খেত। খাওয়া শেষে নিজেই ধুয়ে আবার একই জায়গায় এনে রাখত। খটকা লাগল, বাটি কোথায়? বাটি উধাও, সেও উধাও!
এই বিশেষ বাটি সে দুটো কাজে ব্যবহার করে। এক. খাবারের সময়। দুই. পানি সেচার সময়।
পুকুরের পশ্চিম কোনায় একটু ধানের জমি আছে আমাদের। শীতের মৌসুমে সবজিও চাষ হতো সেখানে। পানির দরকার হলে আব্বু ছোট্ট ড্রেনের মতো করে পথ তৈরি করত। তারপর পুকুর থেকে পানি সেচে সেই সবজিতে পানির ব্যবস্থা করত। আব্বুর সঙ্গে আনিসুলও ছুটে যেত নিজের ভাত খাওয়ার বাটি নিয়ে। পানি সেচত। মনে পড়ে—বেচারা এক মিনিট সেচে দশ মিনিট জিরিয়ে নিতো।
পানি সেচার বিষয়টা মাথায় আসতেই ছুটে চললাম পুকুরের পশ্চিম পানে। জায়গাটা ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। পাশেই কবরস্থান। সেখানেও নাম না জানা কত শত গাছগাছালির হাট। খুব বেশি দরকার না পড়লে কেউ যায় না। সন্ধ্যার পর তো মোটেই না। পুকুরটার যেমন সুবিশাল গভীরতা, ঠিক তেমনই দৈর্ঘ্য-প্রস্থ। পুকুরের পশ্চিম-দক্ষিণ কোনায় কেউ থেকে থাকলেও সহজেই নজরে না পড়ার সবচেয়ে বড় কারণটা হচ্ছে তার আকৃতি। বর্গাকৃতির দেহ শেষ হয়ে পশ্চিম-দক্ষিণ কোনার অংশটা আরও সামনে এগিয়ে যেন ব্যাটের হাতলের আকৃতি প্রদান করেছে।
কাছাকাছি পৌঁছে শুনতে পেলাম ঝপাৎঝপাৎ পানি উছলে পড়ার শব্দ। ওই তো দেখা যাচ্ছে তাকে! বাটি দিয়ে পানি সেচে সেচে আমাদের ধনিয়া চারাগুলো ডুবিয়ে একাকার। সেই সকাল থেকে তবে সেচে আসছে!
আমি চিৎকার করে ডাকলাম, ‘ঐ রে কোল বেঙ্গুরা!’
আনিসুল পিঠ সোজা করে পেছনে ফিরল। রাগে-ক্ষোভে কান মলতে মলতে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে এলাম।
সারা পাড়ার মানুষ জড়ো হয়েছে উঠানে। বেচারা পারলে পালিয়ে বাঁচে। আব্বা শলার মুঠি হাতে দাঁড়িয়ে। আম্মাজান তার আদরের ছোট ছেলেকে ফিরে পেয়ে কেঁদেই ফেললেন। ছোঁ মেরে শলার মুঠি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললেন দূরে। পৃথিবীর সব শলার মুঠি পুড়ে ভস্ম হোক। তবু খোকার গায়ে আঁচড় না পড়ুক।
‘জিগাও তারে, কামলা খাইটা যে আসছে সারা দিন, কত পাইছে?’ রেগে প্রশ্ন করলেন আব্বা।
আম্মার সহানুভূতি পেয়ে আনিসুলও ফোঁসে উঠল। বলল, ‘গোসলের সময় মুতে ধরছে, মুতে দিছি পুকুরে। হেরা কয়, যেই ব্যক্তি পুকুরে মুতে, সেই ব্যক্তিকে কেয়ামতের দিন পুকুরের সব পানি খাওয়াবে আল্লাহ। সিঁচতে গেছি, পানি না থাকলে আল্লায় কেমনে খাওয়াইবে?’
আনিসুলের কথা শুনে আম্মা হাসে। আম্মার চোখে পানি, মুখে হাসি। কী সুন্দর লাগে আম্মার মুখ। উঠানভর্তি হাসির কল্লোল। সবার মুখে মুখে কৌতূহল।
আব্বাকে আর দেখা গেল না। যেন অক্সিজেন হয়ে কারও পেটে লুকিয়ে গেলেন!
আম্মা টেনে নিলেন ভাত খাওয়াতে। কিন্তু আনিসুল এখন ভাত খাবে না। পেটে হাত বুলিয়ে দেখাচ্ছে পেট ভর্তি। সারাদিন পুকুরের পানি খেয়েছে। একটু একটু করে কমানোর চেষ্টা করেছে বৈকি।
সারা দিন পুকুরের পানি খেয়েছে শুনে আম্মা খেপেছে। ওরে গর্দভ রে! বলে চওড়া হাতের ধপাৎ থাপ্পড় পিঠে পড়তেই ভাইটা ভ্যাঁ করে কান্না করে দিল।
বরুড়া, কুমিল্লা