স্বপ্নের মাছ

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

—এই রোকন। রোকন, জলদি শোনে যা।
—কেন ডাকছিস লাবু?
বন্ধু লাবুর ডাকে রোকন বই–খাতা ফেলে বাইরে বারান্দায় আসে।
—শোন, বড় রাস্তায় যাবি? মনারা সবাই গেছে। তোকে ওরা ডাকতে বলল। তাই তোকে নিতে এলাম।
—কী হয়েছে বড় রাস্তায়?
—আর বলিস না। সারা রাত বৃষ্টি হওয়াতে বড় রাস্তায় পানি থই থই করছে। দু–একটা নৌকাও নেমে গেছে যাত্রী পারাপার করতে। মনা বলল, অনেক কই আর মাগুর মাছ জলের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। চল, আমরা সবাই মিলে মাছ ধরব। একটা চুপড়ি নিয়ে নে।

ভরদুপুর। মা হোমওয়ার্ক করতে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। রোকন একটু ভয়ও পাচ্ছে, যদি মা ওঠে পড়ে, তাহলে রক্ষা নেই। সপাং সপাং বেতের বাড়ি নির্ঘাত খেতে হবে। রোকন মনে মনে ভাবে, কত দিন কই, মাগুর খাইনি। মাছ খেতে গিয়ে একটু না হয় মার খেলাম। তা ছাড়া মাছ পেলে মা–ও খুব খুশি হবে, রোকন ভাবে।
খুব সাবধানে উঠান পেরিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চুপড়িটা নিয়ে নেয় রোকন। আলু–পেঁয়াজগুলো মাটিতে রেখে দেয়। দুপুরবেলা আলু–পটোল ভাজি দিয়ে খিচুড়ি খেয়েছিল। আহ! সঙ্গে যদি মাছ থাকত, কী যে মজা হতো। মনে করেই জিবে পানি এসে যায় রোকনের।

আকাশ ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে, বৃষ্টি নামার আর সম্ভাবনা নেই। রোকন আর লাবু একরকম দৌড়াতে দৌড়াতেই বড় রাস্তায় গিয়ে হাজির হয়। সত্যিই তো, বড় রাস্তার পানিতে কই, মাগুর ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে হয় কোনো পুকুরে ওরা এসেছে।
—রোকন, চুপড়ি তো এনেছিস মাছ ধরতে; কিন্তু থলে তো নেই, রাখব কিসে?
—আমি এনেছি দুটি থলে। এই নে।
মনা ওদের চিন্তা দূর করল। বেশ কটা মাগুর, কই থলেতে জমা হলো। রোকনের খুশি আর ধরে না।
—চল লাবু, এবার আমরা বাড়ি যাই।
মনা এগিয়ে এসে বলে, আমরা সবাই মিলে একটু নৌকায় বেড়িয়ে এলে খুব মজা হবে। রোকনেরও খুব ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু পকেটে কোনো পয়সা নেই। মনা বোধ হয় রোকনের মনের কথা বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে বলল,
—চিন্তা করিস না, আমার কাছে ২০ টাকা আছে। চারজন মিলে একটু ঘুরতে পারব।
রোকন আর আপত্তি করে না। বহুদিন পর সে যেন একটু আনন্দের স্বাদ গ্রহণ করছে। ওরা চার বন্ধু মিলে বেশ খানিকক্ষণ নৌকায় ভ্রমণ করে। রোকন তারপর বাড়ির দিকে রওনা হলো।

‘আর মেরো না মা, আর মেরো না। আমার মাছ খেতে ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিল; তাই লাবুদের সঙ্গে গিয়েছিলাম।’ বলে কাঁদতে থাকে রোকন।
—কি রে রোকন, কী হয়েছে? কে মারছে তোকে?
মায়ের ডাকে রোকন ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। কোথায় মাছ, কোথায় পানি। রোকন হেসে ওঠে, সঙ্গে মা–ও হাসে। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে রোকন তার স্বপ্নের কথা শোনায়।
—আচ্ছা মা, স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো, তাহলে কি মজা হতো বলো তো? কত দিন মাছ খাইনি বলো। আর তোমার হাতের কই মাছের দোপেয়াজি, সঙ্গে টমেটো ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ—আহ!
মায়ের দুচোখে জল চলে আসে। রোকন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
— জানো মা, কই মাছে না অনেক কাঁটা। বেশি না খাওয়াই ভালো। আর ছোট মাছে অনেক উপকার। চোখ ভালো থাকে, বাছার ঝামেলা নেই।

আরও পড়ুন

রোকন আর টোকনকে নিয়ে লোপার ছোট্ট সংসার। রোকন তখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। টোকন ক্লাস এইটে। পাঁচ বছর হলো ওদের বাবা টাইফয়েডে মারা যায়। রেখে যায় দুই ছেলে আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পেনশনের টাকায় মোটামুটি চলে যায়। এককালীন ভালো অঙ্কের একটা টাকা পেয়েছিল লোপা। ওটাই ভরসা দুই ছেলেকে মানুষ করা, ওদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়াতে। মাস গেলে বাড়িভাড়া, কোচিং আর স্কুলের বেতন—সারাক্ষণ সংসারের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে লোপা।
রোকন আর টোকন নাশতা করে স্কুলে চলে যায়। লোপাও ওদের সঙ্গে চা-নাশতা সেরে আলমারিটা খোলে। মাসের শেষ সপ্তাহ, হাতে গোনা টাকায় সব সময় তাল মেলাতে হয়। ভোরে রোকনের স্বপ্নের কথা মনে করে মাটির ব্যাংকটা ভেঙে ফেলে। এক হাজার টাকা নিয়ে বাকি টাকা রেখে দেয়। বাজারে গিয়ে আটটা কই মাছ, একটা মুরগি আর একটা মাটির ব্যাংকও কেনে। বাড়ি এসে বাকি টাকাগুলো তাড়াতাড়ি ব্যাংকে রেখে দেয়। মাছগুলো দোপেয়াজি করে মুরগিটা আলু দিয়ে রান্না করে। একটু খিচুড়ি রাঁধে। মনে মনে ভাবে, আজ ওরা কী যে খুশি হবে দুপুরে খেতে বসে।

দুই ভাই স্কুল থেকে ফিরে এলে তিনজন একসঙ্গে খেতে বসে। রোকনের চক্ষু চড়কগাছ!
—এ কি! মা, আমার রাতের স্বপ্নটা কি সত্যি ছিল?
ভাতের থালা রেখে জড়িয়ে ধরে মাকে সে।
—আমার আনা মাছগুলোই কি রেঁধেছ মা?
মা হাসতে হাসতে বলে, ‘হ্যাঁ রে। তোর ধরা সেই কই মাছগুলোই রেঁধেছি।’ বলে আবার হাসতে থাকে লোপা। বড় তৃপ্তি নিয়ে ওরা তিনজনেই খেতে থাকে।

মিরপুর, ঢাকা