আশ্বিন মাসের বৃষ্টি

গোধূলিবেলায় মাঝি তাঁর নৌকা তীরে ভেড়াচ্ছেনছবি: সোয়েল রানা

সারা দিন রোদ আর ঘাম-ঝরানো গরম। শুক্রবার হওয়ায় অফিস-আদালত নেই। জুমার নামাজের পরে খাওয়াদাওয়া শেষে ভাবছি একটা ঘুম দেব। কিন্তু এই ডাকবাংলোয় আমার সুখ-দুঃখের ভাগীদার ইঞ্জিনিয়ার রফিক সাহেব হঠাৎ কড়া নাড়লেন দরজায়। ভেতরে ঢুকেই ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই, ঘুমাবেন নাকি?’
-ইচ্ছে তো ছিল!
-এই চার দেয়ালে বন্দী না থেকে চলেন একটু ঘুরে আসি।
-কোথায় যেতে চাচ্ছেন?
-চলেন বালাসীঘাটের দিকে যাই।

পানি থাকুক বা না থাকুক, এই বালাসীঘাট যমুনা নদীর অন্যান্য ঘাটের চেয়ে বেশ সুন্দর একটা স্থান। ‘আচ্ছা যাব, আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিই। রোদটাও পড়ুক একটু।’ বললাম আমি।
ঘোরাঘুরি আমাদের একধরনের নেশা। তবু ওনার তাড়া দেওয়ার বিশেষ কারণ ছিল। ওনার বিছানায় ছারপোকার উপদ্রব বেড়েছে। তাই বেডশিট, তোশক ও বালিশের কাভার ধুয়ে ছাদে শুকাতে দিয়েছেন। এ কারণে শোয়ার ব্যবস্থা নেই।
যাই হোক, চাপাচাপির কারণে অগত্যা ঘুমকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বালাসীঘাট যাওয়ার আগে কঞ্চিপাড়ার দিকে ঢুকলাম, এক পরিচিতের আবদারে। গ্রামের রাস্তা। পিচের ছালবাকলা উঠে গেছে। রাস্তার দুধারে সবুজ ধানখেতের ঢেউ আমাদের শরীরে এসে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। সবুজের সেকি নয়নাভিরাম সমারোহ!
কিছুক্ষণ পর পৌঁছে যাই বালাসীঘাটে। ‘ভাই, পানি কিন্তু আজ অনেক স্বচ্ছ। নৌকায় না চড়লে মিস করব।’ বললেন ইঞ্জিনিয়ার।

প্রায়ই এখানে আসা হয় বলে অনেক মাঝি আমাদের চেনেন। দর-কষাকষির দরকার হয় না। আমাদের দেখেই ঘিরে ধরে তিন থেকে চারটি নৌকা। একটাতে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় এক ভিক্ষুকের আবদার। হাতে সময় কম থাকায় ‘পরে নিয়ো’ বলে উঠে পড়লাম নৌকায়। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মুখে বিরক্তির কালো রং। ‘শালারা খুব জ্বালায়, স্যার!’ ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলেন মাঝি। শেষ বিকেলের রোদে সাড়ে তিন হাত মানুষের দেহের ছায়া ত্রিশ হাতেরও বেশি হয়ে গেছে।

অনেক ঘুরলাম আজ। চরে কাশফুলের কাছে পর্যন্ত যাই। আশ্বিন মাস। নদীতে পানি নেই খুব একটা। মাঝেমধ্যে শীতল হাওয়া গায়ে লাগলেও ভ্যাপসা গরম বাতাসের আধিক্য নদীর বুকজুড়ে। নৌভ্রমণ শেষ করে গরুর খাঁটি দুধের এক কাপ চা খেয়ে রিকশা নিলাম। শহরে ফেরার পালা। রিকশাওয়ালা একটু বয়স্ক। রিকশায় উঠে কিছু দূর যেতেই মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ছেয়ে গেল আকাশটা। ‘মুরব্বি, বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে।’ রিকশাওয়ালাকে বললাম আমি। ‘হবারও পায় বাহে, দেওয়া যে আন্ধার করি আসিল!’ রিকশাওয়ালার কথা শেষ হতে না হতেই শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টি। যেন কালবৈশাখী। নিরুপায় হয়ে আশ্রয় খুঁজি এক স্কুলের বারান্দায়। বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে যায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ‘হায়! হায়!’ বলে ওঠার শব্দ।
-কী হয়েছে, ভাই?
-আরে আমার তোশক, বেডশিট, বালিশের কাভার—কত কিছু তো ছাদে শুকাতে দেওয়া আছে! সব বুঝি ভিজে গেল ওদিকে!
-টেনশন নিয়েন না। আল্লাহ ভরসা।’ কিন্তু ভরসা পাচ্ছেন না তিনি।

আমাদের এসব সংলাপ রিকশাওয়ালা মুরব্বি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আর মুচকি মুচকি হাসছেন।
-‘কী মুরব্বি, হাসেন কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
-চাচা, তোমরা চাকরান্দার মানুষ, বাহে। তোমরা কি আর হামার হাসির মানে বুঝবে?
-বলেন শুনি।
-গত আউশে বিঘেখানেক ধান আবাদ কচ্চিল্যাম। নাগাড়ি ঝড়ির ঠেলায় ৩০০ ট্যাহার কমলা ৫০০-৭০০ ট্যাহা হছিল। ধানও পাছি কম। দামও নাই। ৫০০-৫৫০ ট্যাহা মণ!’ একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, ‘ফলগুল্যাও সোইগ পচি গেইছে, শুকাইবার পাই নাই!’

বৃষ্টি এখনো থামেনি। সঙ্গে বাতাস তো আছেই। মুরব্বি আবারও বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ চোখ তুলি দেখছে এবার। এই আশ্বিন মাসে ঝড়ি হলে আমন ধানের ফলন ভালো হয় বাহে। ন্যাদরা পোকা, মাজরা পোকা, চুঙ্গি পোকা আরও মেলা মেলা পোকামাকড় মরি যায় ঝড়ির ডাঙে। আল্লায় যা করে, ভালো করে। ক্যা, সার নিয়েও ঝামেলা বাহে। ডিলারের কাছে গেলে যে সার দেয়, তাক দিয়ে হয় না। বাইরে কিনব্যার যাইবেন ৩০-৩৫ ট্যাহা দর!...’

উপদেষ্টা, কুড়িগ্রাম বন্ধুসভা