হুট করে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে নতুন বন্ধু খোঁজার দিবসের আবহাওয়া দেখে মনে পড়ল, আরে আমাদের তো পরম আশ্রয়স্থল ‘বন্ধুসভা’ রয়েছে! ‘অংসংসারী’ বন্ধুদের মহা মিলনমেলায় নতুন বন্ধুরা গিয়ে যেসব কাণ্ডকারখানা ঘটায়, তা দেখলে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বও এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়াবে।
মনে পড়ে বন্ধুসভার প্রথম দিনটির কথা। খুব আগ্রহের স্বরে, ক্যাবলা ক্যাবলা মুখে গিয়ে অনিক ভাইকে বললাম, ‘ভাইয়া, আমার বন্ধু কীভাবে হবে?’
র্যাব উপাধিত অনিক ভাই গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘বন্ধু বানাতে চাও! তাহলে আগে আমাদের সঙ্গে তিনটা প্রোগ্রাম করো, দুটো মিটিংয়ে উপস্থিত থাকো, একটা রিপোর্ট লেখো। তারপর দেখবে, বন্ধুত্ব এমনিতেই হয়ে গেছে!’
আচ্ছা মিশন তো আমার শুরু।
প্রথমে এক ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার শখ কী?’
তিনি বললেন, ‘স্বেচ্ছাসেবা।’
‘অবসরে কী করেন?’
‘স্বেচ্ছাসেবা।’
‘প্রিয় খাবার?’
‘প্রোগ্রামে যা দেয়।’
আমি আর প্রশ্ন করলাম না। বুঝলাম, মানুষটির ব্যক্তিজীবন বলে কিছু নেই। তিনি নিজেই একটা চলমান সাংগঠনিক কার্যক্রম। তিনি আমাদের ঐতিহাসিক পাপ্পু ভাই।
এরপর নতুন বন্ধু জয়ের সঙ্গে পরিচয়। বললাম, ‘আপনি কি নতুন বন্ধু বানাতে এসেছেন?’
তিনি বললেন, ‘জি।’
‘কী ধরনের বন্ধু পছন্দ?’
‘যে আমার পোস্টে লাইক দেবে, স্টোরিতে রিপ্লাই দেবে, জন্মদিনে উইশ করবে।’
আমি আশ্বস্ত হয়ে বললাম, ‘এগুলো তো আমিও পারি।’
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘তাহলে আগে আমার গত পাঁচটা পোস্টে লাইক দিয়ে আসেন।’
বন্ধুত্বের প্রথম ধাপেই ডিজিটাল জামানত! বুঝলাম, এখন আর শুধু মন মেলালেই চলে না, অ্যালগরিদমও মেলাতে হয়।
বন্ধুসভার মধ্যাহ্নভোজে আরেক বন্ধু নাদিরার পাশে বসে বললাম, ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগল।’
তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘আমারও।’
তারপর আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কি হাড্ডিটা খাবেন?’
বন্ধুত্বের শুরুতেই এত আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ। পরে বুঝলাম, তিনি আমার মনের খবর নিচ্ছিলেন না, হাড্ডির ভবিষ্যৎ জানতে চাইছিলেন।
বুঝলাম, খুব একটা সুবিধা এ বছর করতে পারিনি। পরে আমাদের শিহাব ভাই তাঁর আইডিয়া দিয়ে ফাটিয়ে দিয়েছেন।
আগামী বছর নতুন বন্ধু খোঁজার দিবসে বন্ধুসভায় যাওয়ার আগে ফেসবুকে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার দিয়ে পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা আর প্রোগ্রামে মনোপযুক্ত ঝাকানাকা ছবি তুলে দেওয়ার আশ্বাস রেখে সব লিখে একটি সিভি বানিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে যাবা।
শিরোনাম হবে: ‘বন্ধু পদে আগ্রহী প্রার্থী’।
দক্ষতা: প্রয়োজনে বিপদে পাশে থেকে শেষ শিঙারাটিও ভাগ করে খাওয়া।
প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা: নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব, নিয়মিত আড্ডা এবং মাঝেমধ্যে বিনা মূল্যে চা।
বন্ধুসভার এই রমরমা আসরে বসেই মাথার মধ্যে একটা মহাদার্শনিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। ‘বন্ধুসভা’ তো আছে, কিন্তু ‘বান্ধুবী সভা’ নামে কোনো বান্ধবী খোঁজার স্বতন্ত্র সংগঠন নেই কেন?
যদি সত্যিই ‘বান্ধুবী সভা’ নামে আলাদা কিছু থাকত, তবে পৃথিবীর সভার ধরন ও আলাপচারিতা কবেই পাল্টে যেত! সেখানে কী হতো একটু কল্পনা করুন তো?
মিটিংয়ের মূল অ্যাজেন্ডা হতো কার শাড়ির সঙ্গে কার কানের দুল ম্যাচ করেছে এবং কার লিপস্টিকের শেডটা বেশি সুন্দর।
চা-নাশতার বিল পরিশোধের সময় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে, সেখানে সেই সুযোগই থাকত না। বিল দেওয়া নিয়ে শুরু হতো এক মহাকাব্যিক বিতর্ক। নির্মম গণিতশাস্ত্র, যেখানে দুই যোগ দুই কোনোভাবেই পাঁচ হতে দেয় না!
যা–ই হোক, যারা স্পেশাল টর্চলাইট জ্বালিয়েও বন্ধু খুঁজে পায় না, তাদের খানিকটা মানসম্মান অক্ষুণ্ন রাখতেই এ দিবস।
প্রশিক্ষণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা