বুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা প্রাচীনত্বে নয়, বরং কিছু মৌলিক প্রশ্নের স্থায়িত্বে

চীনের শানসি প্রদেশে ১৫০০ হাজার বছর পুরোনো ২০৭ ফুট উচ্চতার বুদ্ধমূর্তিছবি: সংগৃহীত

সৃষ্টির পর থেকে মানুষ আজও ঘুরছে একটি প্রশ্নের উত্তরের আশায়, মানুষ কেন দুঃখ পায়?

গৌতম বুদ্ধ যখন বোধি (জ্ঞান) লাভ করলেন, তখন তিনি চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করলেন। প্রথম আর্যসত্য হচ্ছে, সর্বম্ দুঃখম্ দুঃখম্ অর্থাৎ সংসারের সবকিছু দুঃখময়। তাঁর উপলব্ধ জ্ঞান মানবসভ্যতার উন্নয়ন, বিকাশ, চিন্তা-চেতনায় বিস্তর প্রভাব রেখেছে।

বর্তমান আধুনিক যুগে মানুষের ব্যাস্ততা বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে। আমাদের সময় হয় না প্রতিবেশীর খবর নেওয়ার, সময় হয় না বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলার। এত সময়ে-অসময়ের মধ্যেও যে জিনিসটা রয়ে গেছে তা হলো, মানুষের চিরন্তন দুঃখবোধ। এই দুঃখবোধ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও বটে।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মানুষকে দুঃখ, দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধন ও মাতা মায়াদেবীর পুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন। খুঁজতে থাকেন মানুষের এই সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণার কারণ। আমরা সুখ, আনন্দ, প্রমোদ সব সময় চাই; কিন্তু এগুলো মানবজীবনে স্হায়ী নয়। আমরা সুখ পাওয়ার লোভে কষ্ট পাই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এ পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয় কিংবা কোনো কিছুই আমাদের নয়।

বর্তমান ভোগবাদী অর্থনীতির যুগে চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নতুন চাহিদা তৈরি হয়, বিজ্ঞাপনের রঙিন আলো আমাদের মনকে অশান্ত করে। কিছু পণ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা এখন সামাজিক অবস্থান বোঝানোর সূক্ষ্ম মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবিক জীবনে এসবের আসলেই কি প্রয়োজন আছে? পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতার কারণে। বর্তমান সমাজে ব্যক্তিগত অর্জন সাফল্যের চাবিকাঠিতে পরিণত হয়েছে। এখন একটা প্রশ্ন করা যেতেই পারে, আমরা আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করছি নাকি আকাঙ্ক্ষা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে।

মানুষ পরিবর্তনশীলতাকে সহজে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু চারপাশে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। মানুষের মন, রাষ্ট্র, সমাজ, জাতি, মানচিত্র, প্রযুক্তি, চিন্তা, চেতনা এমনকি ব্যক্তিত্বও। পরিবর্তন গ্রহণ করতে না পারার কারণেই মানুষের মনে দুঃখের সৃষ্টি হয়, বুদ্ধের দর্শনে অনিত্যবাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনিত্য শব্দের অর্থ হলো যা ক্ষণস্থায়ী বা নশ্বর।

তথাগত (‘তথাগত’ শব্দের অর্থ শূন্যতা থেকে আগমন যার এবং শূন্যতায় গমন যার)
বুদ্ধ যখন রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে গভীর সাধনায় লীন হলেন, তখন চরম ক্ষুধা ও শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে আঁকড়ে ধরল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে চরম ভোগবাদ কিংবা চরম কঠোরতা কখনোই সাফল্য এনে দেবে না। তিনি মধ্যমার্গ বা মধ্যপন্থার অবলম্বন করলেন। মধ্যমার্গ ভারসাম্য ও সংযমকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতিরিক্ত ব্যয়, খাবার, বিনোদনের মাধ্যম, শো-অফের কি আসলেই প্রয়োজন আছে? এ সবকিছু নিজের মনকে আরও আগ্রাসী করার পাশাপাশি অন্যকেও আগ্রাসী করে তোলে।

আরও পড়ুন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায় জর্জরিত এবং বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। বর্তমানে মানুষ নিজেকে বুঝতে চায় না, একে অপরেরটা দেখে ভাবে, আমার সবকিছুও যেন এ রকম পারফেক্ট, মসৃণ হয়। কিন্তু আফসোস, সেভাবে হয় না। বুদ্ধ বলছেন, শুধু শান্ত থাকা নয় বরং মানসিক শান্তি পেতে হলে নিজেকে বুঝতে, জানতে হবে। কেননা, অনেকে চন্দনবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলেও চন্দনগাছ চোখে পড়ে না।

পৃথিবী বদলেছে, সমাজ, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, রাষ্ট্র এমনকি জীবনযাপনও বদলেছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতা বদলায়নি। আমরা এখনো অতীত নিয়ে অনুতপ্ত হই, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করি। তথাগত নতুন কোনো পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দেননি, তিনি শুধু অভিজ্ঞতা ও অনুভবের জায়গাটা পরখ করে দেখার কথা বলেছেন, বিশ্লেষণের কথা বলেছেন। বুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তাঁর প্রাচীনত্বে নয়, বরং দৈনন্দিন কিছু মৌলিক প্রশ্নের স্থায়িত্বে।

সব শেষে একটা কথা ঠিকই থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা কী চাই?

সহসভাপতি, সিলেট বন্ধুসভা