ভাবতাম, বাড়ি গেলেই তোমার নিরাপদ ছায়া পাব

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

প্রিয় মা,

কবে থেকে তোমায় চিনি, তা বলতে পারব না। শুধু এটুকু বলতে পারি, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে তোমার মুখটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। পুরোটা সত্তাজুড়ে তোমার বিচরণ। খেলার মাঠে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, তোমার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। অদ্ভুত এক শান্তি লাগত মনে। ভাবতাম, এই তো আর কিছুক্ষণ; তারপর বাড়ি গেলেই তোমার নিরাপদ ছায়া পাব।

প্রতিদিন স্কুলে যাবার সময় তোমার মুখটা খুব করুণ হয়ে উঠত। একা একা না খেয়ে রোজ আমার জন্য অপেক্ষা করতে। যখন বাড়ি ফিরতাম, দরজা খুলে পবিত্র একটা হাসি দিতে। অবুঝ আমি তোমার খুশির কারণ বুঝতাম না! আমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে তবে তুমি নিজে খেতে। রাতে ঘুমানোর সময় খুব ভয় পেতাম; পা দুটো তোমার পায়ের ভাঁজে গুজে দিতাম, পাছে ভূত এসে আমার পা খেয়ে ফেলে! কী বোকাই না ছিলাম আমি। তুমি খুব হাসতে আমার পাগলামি দেখে।

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। হঠাৎ তুমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে। আমাদের দুই ভাইয়ের দেখাশোনা করতে করতে নিজের একদম যত্ন নিতে না। ডাক্তার, হাসপাতাল দৌড়াদৌড়ি—সে এক হযবরল অবস্থা। ঠিক হলো তোমার অপারেশন হবে। আমি তো ভয়ে শেষ। এই বুঝি তোমাকে হারালাম! দিনরাত শুধু কাঁদতাম আর ভগবানকে ডাকতাম যেন তিনি তোমাকে সুস্থ করে দেন। তোমার অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হলো। আস্তে আস্তে সুস্থ হতে থাকলে। তখন আমার খুশি দেখে কে? এভাবে তিনটা মাস কেটে গেল। আজও মনে পড়ে সেই তিনটা মাস জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। তোমাকে ফিরে পাবার আনন্দে সবাই আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। আস্তে আস্তে সব আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। ভীষণ একাকীত্বে ভোগা তুমি খুব চাইতে আমি যেন তোমাকে বেশি বেশি সময় দিই। হায়রে অবুঝ-অপদার্থ আমি, তোমার সেই না বলা চাওয়াটা কখনো বুঝতে পারিনি। হয়তো বয়স কম ছিল বলে।

একদিন তোমার খুব জ্বর উঠল। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন টাইফয়েড জ্বর। ঠিকমত ওষুধ খেলে কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবে। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। চিকিৎসা চলতে থাকল। কিন্তু তোমার অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি হতে থাকল। একপর্যায়ে তুমি একদম চুপ হয়ে গেলে। কোনো কথা বলতে না, নড়াচড়া করতে না—এমনকি চোখের পলক পর্যন্ত ফেলতে না! জানতে পারলাম ডাক্তারি ভাষায় একে ‘কোমা’ বলে। ডাক্তার যখন তোমার হাতে ইনজেকশন দিতেন, ছলকে তোমার হাত থেকে রক্ত বের হয়ে পড়ত; অথচ তোমার কোনো বিকারই হতো না। খুব কষ্ট হতো তোমাকে দেখে। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতাম। তোমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। পরম নির্ভরতার আশ্রয়স্থল তুমি কোমায় চলে গিয়ে আমার মাঝে কী যে এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছিলে, তা বলে বোঝাতে পারব না।

সেদিন ছিল বুধবার। বিকেলে তোমাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম সবাই। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে তোমাকে এক নজর দেখে হাসপাতালের বেডেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম পরের দিন এসে তোমাকে ভালো করে দেখে যাব। কিন্তু হায়, মহান বিধাতা আমাদের ভবিষ্যতে কী লিখে রেখেছেন, তা কি আর আমরা জানি? কে জানত, সেটাই হবে তোমাকে আমার শেষ দেখা। সেদিন গভীর রাতে হঠাৎ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি সবাই পাগলের মতো কাঁদছে। যে ভয়টা গত ৭ দিন যাবৎ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, তাই সত্যে পরিণত হলো। দীর্ঘ ৭ দিন কোমায় থেকে তুমি চলে গেলে না ফেরার দেশে! কষ্টে দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার। কী নিষ্ঠুর নিয়তি। যদি জানতাম তুমি চলে যাবে, তাহলে কি ক্লান্তির কারণে অত কম সময় তোমার পাশে থাকতাম? বড় দুঃখ হয় মা। দেখো কী দুর্ভাগা ছেলে আমি। জীবনে একটা বিকেলেও তোমাকে সময় দিইনি! জীবনের কোনো বোর্ড পরীক্ষা দিতে যাবার আগে তোমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে পারিনি। তোমাকে কখনো বলতে পারিনি কতটা ভালোবাসি। ভাবলে কষ্টে বুকটা কেঁপে উঠে।

দেখতে দেখতে ১১টা বছর কেটে গেছে! আজও প্রতি বিকেলে তোমার কথা ভেবে কান্না করি, মা। চিৎকার করে শুধু বলতে ইচ্ছে করে, তোমায় বড় ভালোবাসি মা, তোমায় বড় ভালোবাসি। পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে তুমি যেখানেই থাকো না কেন, ভালো থেকো।

ইতি
তোমার ছেলে

হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত