আজ সকাল থেকে আকাশ ভিজে আছে। মেঘের রং ধূসর, বৃষ্টি কেমন থেমে থেমে ঝরছে। বারান্দার কোণে রাখা বেলি ফুলের গাছ আজ সাদা ফুলে ভরে গেছে। ঘরজুড়ে ভাসছে এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ অথচ ব্যথায় ভরা।
রাহাত দাঁড়িয়ে আছে গাছটার দিকে তাকিয়ে। গাছটা তার নয়, সায়রার দেওয়া। তিন বছর আগে এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে সায়রা রিকশায় চেপে এই ছোট্ট সবুজ গাছ এনে দিয়েছিল।
‘তুমি তো সব সময় বই আর নোটের ভিড়ে ডুবে থাকো। তোমার বারান্দায় একটাও ফুল নেই, তাই ভাবলাম, আমার প্রিয় ফুল এনে দিই। জানো, বেলি ফুলের গন্ধে আমার মন ভরে যায়। তুমি যদি প্রতিদিন এই ফুলের গন্ধে ঘুমাও, হয়তো আমার কথা মনে পড়বে।’ সায়রা বলেছিল।
সেই দুই মাসে সায়রা রাহাতের জীবন আলোয় ভরিয়ে দিল। বৃষ্টিভেজা বিকেলে এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়া, বইয়ের পাতায় নোটস লিখে দেওয়া, কিংবা ফোনের ছোট্ট বার্তা...
সেদিন বৃষ্টির জল গাছের পাতায় ঝরে পড়ছিল। সায়রার চুলে লেগে ছিল অদ্ভুত আলো। রাহাত সেই দৃশ্য এখনো ভুলতে পারেনি।
তখন রাহাত অনার্স পড়ছে। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে আইইএলটিএস কোচিং করছে। একদিন হঠাৎ সায়রা এসে বলল, ‘তুমি কি আমাকে এই টপিকটা বুঝিয়ে দেবে? সবাই বলছে তুমি ভালো পড়াও।’ সেই থেকে তাদের আলাপ শুরু। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব।
কিন্তু সম্পর্কের সূচনা একেবারে সহজ ছিল না। একদিন রাহাতের পোষা বিড়ালটা মারা যায়। অকারণে সে মনে করেছিল, এ ঘটনার পেছনে সায়রার ছায়া আছে—কী অদ্ভুত অভিমান, যার কোনো যুক্তি নেই। সেই অভিমানই রাহাতকে সায়রার প্রতি দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
তবে সায়রার মধ্যে ধৈর্য ছিল। সে কখনো রাহাতকে এড়িয়ে যায়নি। আইইএলটিএসের ক্লাস শেষে দুজন লুকিয়ে হাঁটত পুরোনো রাস্তায়। ভেজা মাটির গন্ধে সায়রা হেসে বলত, ‘জানো, আমি হারানোর ভয় পাই। যাকে পছন্দ করি, যদি সে দূরে চলে যায়…।’
রাহাত কিছু বলতে চেয়েও পারত না। শুধু মনে হতো, সায়রার চোখে যেন এমন এক ভাষা আছে, যা কথার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
একদিন হঠাৎ সায়রা রিকশায় চেপে এল, হাতে একটা ছোট্ট সবুজ টব।
‘এটা তোমার বারান্দায় বসিয়ে দাও। এটা আমার প্রিয় বেলি ফুল। আমি চাই এই ফুলের গন্ধে তুমি আমাকে মনে রাখো।’
রাহাত গাছটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট টব যেন অচেনা কোনো জগতের দরজা খুলে দিল।
কিছুদিন পর সায়রা হঠাৎ বলল, ‘রাহাত, আমি তোমাকে পছন্দ করি। তুমি কি কিছু অনুভব করো না?’
রাহাত নীরব রইল। তার মুখে একটাও শব্দ এল না।
সায়রা কষ্ট পেয়েছিল। তবু বলল, ‘তাহলে অন্তত আমাকে দুই মাস সময় দাও। আমি প্রমাণ করব ভালোবাসা মানে যত্ন।’
সেই দুই মাসে সায়রা রাহাতের জীবন আলোয় ভরিয়ে দিল। বৃষ্টিভেজা বিকেলে এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়া, বইয়ের পাতায় নোটস লিখে দেওয়া, কিংবা ফোনের ছোট্ট বার্তা—সবকিছুই রাহাতের কাছে এক অন্য রকম সুখের উৎস ছিল। ধীরে ধীরে রাহাত বুঝতে পারল, সে–ও সায়রাকে পছন্দ করে। কিন্তু মুখে বলতে পারল না সেই একটি শব্দ—‘ভালোবাসি’।
একদিন তুচ্ছ কিছু একটা ঘটনা নিয়ে ঝগড়া হলো। সেই ঝগড়া প্রচণ্ড রূপ নিল। সায়রা কান্নাভেজা চোখে বলল, ‘তুমি একটুও বোঝো না আমাকে।’
রাহাত রাগে চুপ করে রইল।
তারপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। কয়েক দিন পর তাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সায়রা সবকিছু বন্ধ করে দিল। রাহাত ফোন করেছিল, বার্তা পাঠিয়েছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি।
যখন সায়রার কণ্ঠে ‘হ্যালো’ শোনা গেল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সায়রা তার জীবন থেকে চিরকালের জন্য চলে গেছে।
আজ তিন বছর পর সেই একই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রাহাত। বারান্দার কোণে এখনো বেলি ফুলের গাছ আছে। সাদা ফুলে ভরে গেছে গাছটা। ঘরজুড়ে ভাসছে গন্ধ, যেন সায়রার নিশ্বাস এখনো বাতাসে মিশে আছে।
রাহাত চোখ বন্ধ করে বলে, ‘সায়রা, তুমি না থাকলেও তোমার দেওয়া গাছটা আজও আমাকে মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা হারালেও গন্ধ মুছে যায় না।’
বুকের ভেতর ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে। ভালোবাসা মানেই এখন তার কাছে হারানোর ভয়। তবু বেলি ফুলের গন্ধে মনে হয়, সায়রা আজও কোথাও আছে, এই বাতাসে, এই বৃষ্টিভেজা আকাশে।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ