বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে

অলংকরণ: তুলি

মিথ্যা বলা মহাপাপ—এই বাক্যটি আমাদের অনেকের শৈশবের নৈতিক পাঠ্যবইয়ের প্রথম লাইন। ঘুমপাড়ানি গল্প থেকে শুরু করে স্কুলের নীতিশিক্ষা, পারিবারিক উপদেশ—সবখানেই একই শিক্ষা: সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। গুরুজনদের মুখে শোনা সেই বাক্যগুলো কেবল শব্দ ছিল না, ছিল জীবনের দিশা। সেগুলোকেই পাথেয় করে আমরা নিজেদের গড়ে তুলতে চেয়েছি। চেষ্টা করেছি সৎ থাকার, সত্য বলার, ন্যায়ের পথে হাঁটার। অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি—শিক্ষাজীবনে, ব্যক্তিত্ব গঠনে, এমনকি আত্মসম্মান রক্ষার লড়াইয়েও।

জীবন ধীরে ধীরে প্রবেশ করে নতুন অধ্যায়ে—কর্মজীবন শুরু হয়, সংসার গড়ে ওঠে, দায়িত্ব বাড়ে। এই নতুন অধ্যায়ে পা দিয়েই মানুষ আবিষ্কার করে, বাস্তবতা আর নৈতিক শিক্ষার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। যত দিন যায়, ততই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সামনে আসে। মানুষ পরিপক্ব হয়, কিন্তু সেই পরিপক্বতা আনন্দের চেয়ে প্রশ্নই বেশি তৈরি করে। একসময় মনে হয়— এতদিন কী শিখলাম পরিবারে? কী শিখলাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে? সার্টিফিকেট হাতে নিতে যে শিক্ষা অর্জন করেছি, তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের শিক্ষার কোনো মিলই যেন খুঁজে পাওয়া যায় না।

এই সমাজে প্রবেশ করে হঠাৎ করেই নিজেকে মনে হয় বেমানান। আর দশজন মানুষ যেভাবে অনায়াসে চলতে পারে, যেভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করে, প্রয়োজন অনুযায়ী সত্যকে বাঁকিয়ে নেয়—আমি তা পারছি না। আমার শেখা সততা এখানে যেন অচল মুদ্রা। মধ্যবয়সে এসেও প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে জীবন শিক্ষা নিতে হচ্ছে—কিন্তু সে শিক্ষা আগের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় আমরা যেন এক অদ্ভুত জগতের বাসিন্দা। এখানে সৎ মানুষকে বলা হয় বোকা মানুষ। সততাকে দেখা হয় অযোগ্যতা হিসেবে। সত্য বলাকে মনে করা হয় কৌশলের অভাব। যে মানুষটি নিয়ম মেনে চলে, অন্যায়কে না বলে—তাকে দুর্বল ভাবা হয়, পরাজিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ যে মিথ্যা বলতে পারে সাবলীলভাবে, যে পরিস্থিতি অনুযায়ী মুখ বদলাতে পারে, যে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে এগিয়ে যেতে জানে—তার জয়জয়কার। সে হয়ে ওঠে সফল, চালাক, বাস্তববাদী।

এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরেও গভীরভাবে প্রোথিত। কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বেশি কার্যকর। ন্যায়ের চেয়ে যোগাযোগ শক্তিশালী। সত্যের চেয়ে সুবিধাজনক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য। রাজনীতি, প্রশাসন, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও মিথ্যা যেন এক স্বীকৃত হাতিয়ার। ফলস্বরূপ, সততা আজ আর আদর্শ নয়—বরং একধরনের ঝুঁকি।

এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় আত্মিক দ্বন্দ্বে। যে মানুষটি শৈশব থেকে সততার মূল্য শিখে এসেছে, সে হঠাৎ করে বুঝতে পারে—এই সমাজে টিকে থাকতে হলে তাকে হয় বদলাতে হবে, নয়তো নিঃসঙ্গ হতে হবে। অনেকেই বদলে যায়। কেউ কেউ নিজের বিবেকের সঙ্গে আপস করে নেয়। আবার কেউ কেউ বদলায় না—তারা নীরবে কষ্ট বহন করে, নিজেকে প্রশ্ন করে, সমাজকে প্রশ্ন করে।

মধ্যবয়সে এসে এই প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হয়। কারণ, এই বয়সে মানুষ জীবনের অনেক পথ হেঁটে আসে, অনেক স্বপ্ন ভাঙে, অনেক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তখন সে বুঝতে পারে—জীবন শুধু সাফল্যের হিসাব নয়, আত্মসম্মানের হিসাবও। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজকের সমাজে আত্মসম্মানের মূল্য খুব কমই দেওয়া হয়, যদি তা সুবিধার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তবু সব অন্ধকারের মধ্যেও সততার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। হয়তো সততা এখন আর দ্রুত সাফল্যের পথ নয়, কিন্তু এটি এখনো মানুষের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখে। সততা হয়তো বাহ্যিকভাবে দুর্বল মনে হয়, কিন্তু তা আত্মিক শক্তির প্রতীক। মিথ্যার জয়জয়কার সাময়িক হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরে শূন্যতা জমে। আর সততার পথ কণ্টকাকীর্ণ হলেও, সেখানে অন্তত নিজেকে চোখে চোখ রেখে দেখার সাহস থাকে।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই মূল্যবোধগুলোকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ যদি একসঙ্গে আবার নৈতিকতার গুরুত্ব উপলব্ধি না করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও বেশি বিভ্রান্ত হবে। তখন মিথ্যা শুধু গ্রহণযোগ্যই নয়, প্রশংসনীয় হয়ে উঠবে—আর সততা থাকবে নিছক গল্পে।

এই প্রবন্ধ কোনো উপদেশ নয়, বরং এক মধ্যবয়সী মানুষের আত্মকথা—যে এখনো প্রতিদিন জীবন শিক্ষা নিচ্ছে, প্রশ্ন করছে, দ্বিধায় ভুগছে। হয়তো সে সমাজের সঙ্গে পুরোপুরি খাপখাইয়ে নিতে পারছে না, কিন্তু সে জানে—এই না-পারাটুকুই তার মানবিক পরিচয়। কারণ সব সময় জয়ী হওয়াই মানুষ হওয়া নয়; কখনো কখনো সৎ থেকেও টিকে থাকার চেষ্টা করাটাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর