ছাত্র শর্তে রাজি হলো। সে দেখতে পেল, তার শিক্ষক জানালা দিয়ে লম্বা আকারের হাত বের করে গাছ থেকে কাঁঠালের পাতা ছিঁড়তে লাগল। ছাত্রের মা রান্নাঘর থেকে দেখল, লম্বা একটা হাত গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ছে।
ছেলেবেলায় মায়ের কোলে বসে পরির দিঘির কথা অনেক শুনেছি। যখন বুঝতে শিখেছি, বায়না ধরতাম পরির দিঘি দেখতে যাব। মা বলতেন, এটা দেখতে আরও বড় হতে হবে। আমি শুধু বড় হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। রাতে ঘুমানোর সময় লাল পরি, নীল পরির ছবি আঁকতাম মনের ক্যানভাসে। কখনো গায়ের রোম কাঁটা দিয়ে উঠত। তারপর স্কুলে পড়ার সময় আমি নিজেই গিয়েছিলাম পরির দিঘি দেখতে। সম্প্রতি আরেকবার গেলাম স্মৃতিময় ওই দিঘির পাড়ে।
নানাবাড়ি গিয়ে বহুবার রাতে ঘুমানোর সময় নানির কাছে পরিদের গল্প শুনতাম। নানি একদিন বললেন, তাঁদের ছাদে ভরা পূর্ণিমায় পরির দল এসে নাচ–গান করে। বাড়ির গা বেয়ে ওঠা চিলেকোঠা পর্যন্ত একটি কাঠবাদামগাছ। ওই গাছের ডালে পরিরা দোলনা বানিয়ে দুলত। তারা যে রাতে নাচ-গান করত, সে রাতে গাছের বাদাম খেয়ে নিত। তারপর পুকুরে নেমে সাঁতার কাটত। ছোট পরিরা পানিতে নেমে মুখে পানি নিয়ে বুদ্বুদ করত। এভাবে চলত তাদের পানি–খেলা। শফিক মামাকে একবার এই ছোট পরির দল পুকুরের মাঝখানে টেনে নিয়ে যায়। তিনি পরিদের সঙ্গে খেলা করেন। খেলা শেষে ঘরে ফিরলে মামা শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। আজও শফিক মামা পরিদের সে খেলার ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন!
আমাদের স্কুলে ছগির স্যারের কাছে শুনেছি সেই পরির গল্প। এমনকি পটিয়া মাদ্রাসায় সে সময় নাকি জিন-পরির শিশুরা লেখাপড়া করত। তাদেরকে দেখা যেত না। ছায়া স্পর্শ করা যেত না। স্যার বলেছেন, তারা যেদিন হাটবাজারে যাবে, সেদিন নাকি প্রচুর মাছ-মাংস আর তরকারি বিক্রি হতো। লোকজন বুঝে নিত, পরির পাল নেমেছে, তাই সবকিছু তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। এক পরির ছেলে নাকি পটিয়া মাদ্রাসার পাশের বাড়িতে টিউশনি করত। সে দেখতে অনেক সুন্দর ও মেধাবী ছিল। কিন্তু কেউ জানত না সে পরির ছেলে। এক বৃষ্টির দিনে পরির ছেলে তার ছাত্রকে নিয়ে পড়াতে বসল, ছাত্রের মা তালের রসের পিঠা তৈরি করছিলেন। তালের পিঠা তৈরি করতে কলা বা কাঁঠালের পাতার প্রয়োজন হয়। সন্ধ্যায় আকাশ ঝাঁকিয়ে বৃষ্টি নামল, সঙ্গে বজ্রপাত বিজলি পাতার খেলা। অঝোর বৃষ্টি। ঠিক সে সময় মা ডেকে তার ছেলেকে বলল, কয়েকটা কাঁঠালের পাতা পেড়ে আনার জন্য। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, কীভাবে কাঁঠালের পাতা ছিঁড়বে চিন্তা করতে লাগল। শিক্ষক বিষয়টা টের পেয়ে তাকে বলে, ‘ঠিক আছে তুমি পড়ো। আমি ব্যবস্থা করব।’ পড়ার কক্ষের পাশে কাঁঠালগাছ ছিল। ছাত্রকে বলল, কাউকে বলা যাবে না, এ শর্তে কাঁঠালের পাতা পেড়ে দেবে। ছাত্র শর্তে রাজি হলো। সে দেখতে পেল, তার শিক্ষক জানালা দিয়ে লম্বা আকারের হাত বের করে গাছ থেকে কাঁঠালের পাতা ছিঁড়তে লাগল। ছাত্রের মা রান্নাঘর থেকে দেখল, লম্বা একটা হাত গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ছে। ভয়ে চিৎকার দিল। ছাত্র ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। সবাই দৌড়ে এল। শিক্ষক উধাও।
সেদিন থেকে আর ওই শিক্ষক পড়াতে আসেনি। তাকে মাদ্রাসায়ও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পটিয়ার পরির দিঘিতেও পরি বাস করত। পরির দিঘি নাকি পরিরা এক রাতে খনন করেছিল। পটিয়া সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ১৪ নম্বর বোর্ড কার্যালয়ের পাশে পরির দিঘির অবস্থান। এখন আর সেই বোর্ড কার্যালয় নেই। পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে পাইকপাড়া এলাকায় গেলে দেখা মিলবে পটিয়া পরির দিঘি। দিঘির পাড়ে রেইনট্রি। গাছের ছায়া জলের ওপর জলছবির মতো ভাসছে। একটু সামনে পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। রাস্তার পাশে চায়ের দোকান। সেখানে বসে চা পান করছিলাম। কাপে লিকারের ওম ধোঁয়া ওড়ছিল। এলাকার আড্ডাবাজ তরুণেরা এই দোকানে ভিড় করেন। চাওয়ালা বেশ রসিক। তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানান, এলাকার বড় জ্যাঠা পরির গল্প জানেন। তিনি নিজেই নাকি কয়েকবার পরি দেখেছেন। আমরা কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছি আর এর মধ্যে পাইকপাড়া এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ছালেহ আহমেদ হাজির। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
ছালেহ চাচা আমাদেরকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন পরির দিঘির গল্প শোনাতে। চাচার বয়স প্রায় ৯০। ইংরেজ আমলের লোক। অসংখ্য গল্প জানেন তিনি। বিশ্বযুদ্ধও দেখেছেন। বয়সের ভার তাঁকে সেভাবে কাবু করতে পারেনি। সারা দিন চায়ের দোকানে অথবা বাড়িতে বসে গল্প করে সময় কাটান। অত্যন্ত রহস্য করে কথা বলেন। তাঁর কথা শুনলে মনে হবে, আসলেই ঘটনা এই তো কিছুক্ষণ আগেই ঘটেছে। বললেন, ‘পরি দিঘি এক রাতে খনন হয়েছে, এটা সত্য। এক রাতে! হ্যাঁ। বাপ রে। আর যে রাতে দিঘি খনন হয়, সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। গভীর অন্ধকার। ঝিঁঝি ডাকছে। মানুষের কোনো সাড়া–শব্দ নেই। সারা রাত একটি বাড়িতে ঢেঁকিতে চাল ভাঙা হয়। অমনি চলে খনন। তারপর খপ খপ করে মাটিগুলো সরিয়ে ফেলা হয় অন্য কোথাও। রাত ফরসা হতে থাকে। ভোর হয়। দিঘি খনন শেষ। দিঘি পানিতে ভরে গেল। পরিরা যে কোথায় গেল, কেউ জানে না। সকালে দেখা গেল বিশাল দিঘি। এটিই পরির দিঘি।
ছালেহ চাচা আরও বলেন, পরিরা নাকি ঢেঁকির শব্দ শুনে পালিয়ে যায়। কিন্তু পরের রাতে সেই ঢেঁকিটি দিঘিতে পুঁতে রেখেছিল পরিরা। একসময় ভয়ে মানুষ দিঘিতে নামত না। সবাই জানত, ওখানে পরিদের বাস। পুকুরে নামলে হয়তো কোনো ক্ষতি হবে। সে সময় অলৌকিকভাবে কোনো বিয়েশাদি কিংবা মেজবানে পরির দিঘিতে মাটির হাঁড়িপাতিল ও থালাবাসন পাওয়া যেত। সেগুলো মানুষ ব্যবহার করত। কাজ ফুরালে আবার দিঘির পাড়ে রেখে আসত। দিঘি সেগুলো টেনে নিত তার গভীরে। সে সময় নাকি কে বা কারা একটি থালা গোপনে চুরি করে রেখে দেয়। সেই থেকে পাড়ার মানুষ আর থালাবাসন পেত না। কখনো থালাবাসন ভেসে ওঠেনি। এই হলো ছেলেবেলার গল্পের পরির দিঘি।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা