তখনো ট্রেনিংয়ে কেউ আসেনি। ল্যাপটপ খুলে মেইল চেক করছিলাম। হঠাৎ চোখ সরাতেই মাস্ক পরিহিত একটি মেয়ের দিকে দৃষ্টি আটকে গেল। আমার টেবিলের ঠিক সামনেই বসেছে। চোখে চোখ পড়েছে! সময় বয়ে যাচ্ছে।
পরিচয়পর্বের সময় ভাবছিলাম ওই টেবিলে যদি বসা যেত! জিজ্ঞাসার ছলে অন্তত আরও অনেক কিছু জানার সুযোগ হতো। প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজের ঠিক আগপর্যন্ত মনের ভেতর নিজেই নিজের সঙ্গে এভাবেই কথা বলছিলাম। কাজে মন বসছে না কিছুতেই। মুহূর্তেই চারটি চোখ বুঝে যায় এ ভাষার মর্মার্থ। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছে না। আমাদের কাছে আসা দরকার।
মধ্যাহ্নভোজের টেবিলেও সে আমার সামনের চেয়ারে বসেছে। এবারও পরিচিত হতে পারিনি। মাথা নিচু করে খাওয়াদাওয়া করে উঠে গেলাম। এত আড়ষ্টতা কোথা থেকে এল কে জানে! দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আবারও দুজনে চোখের ইশারায় কথা বলতে শুরু করি। খাবার টেবিলে বলতে শুনলাম তার ছোট ভাই এসেছে। ট্রেনিং থেকে বেরিয়ে সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে বের হবে।
হোটেল থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সে দাঁড়িয়ে অদূরে, রিকশা খুঁজছে। আমি চেয়ে আছি তার পানে। কথা না বলেও যে বিদায় দেওয়া যায়, তা বোধ হয় ওই মায়াবী চোখের দিকে না তাকিয়ে থাকলে বুঝতে পারতাম না।
ট্রেনিংয়ের দ্বিতীয় দিন ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। সে আমার ঠিক সামনে। প্রশিক্ষকের সামনে দুজন দাঁড়িয়ে। তার চোখের দিকে তাকাতেই কেঁপে উঠল বুক। এত সুন্দর ও মায়াভরা চোখ আমি বোধ হয় আর কখনো দেখিনি!
সৈকতে অনেক মানুষ। হারিয়ে ফেললাম তাকে। ট্রেনিং শেষ, আমাদের আর কখনো দেখা হবে না! বিষাদে ছেয়ে যাচ্ছে মন। কানে হেডফোন লাগিয়ে ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে সুগন্ধা থেকে কলাতলীর দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম মায়াবী চোখের সেই মানুষটি সৈকতে ঝিনুক কুড়াচ্ছে!
নিজেকে যেন আবারও ফিরে পেলাম। ফুরফুরে ঢেউয়ের তালে মনও নেচে উঠছে। মন খারাপের সংগীত শেষ হয়ে ভালোবাসার গান বেজে উঠল কানে! এবারও কথা হলো না। পাশ কাটিয়ে কলাতলী বিচের দিকে জনশূন্য একটা জায়গায় গিয়ে শেষ বিকেলের সূর্যাস্তকে বিদায় জানানোর অপেক্ষায় থাকলাম। সে-ও পাশে এসে তার ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি আর ছবি তোলায় ব্যস্ত! আমাদের আবার এভাবে দেখা হবে, কথা হবে না! চোখে চোখ রাখা হবে, কাছে আসা আর হবে না! আমরা কি তাহলে একটা গোলক ধাঁধায় আটকে গেলাম? যেখানেই যাচ্ছি তাকে পাচ্ছি। সূর্য ডুবে গেল। সে আঙুল দিয়ে বিচের পাড়ে কিছু একটা আঁকছে। চোখের ভাষায় আবারও বিদায়। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম!
জোয়ার আসছে। এক্ষুনি দৌড়াতে হবে, না হলে মুছে যেতে পারে, যা আমি দেখতে চাচ্ছি! খেয়াল করিনি, জুতার ফিতা খুলে গিয়েছিল। দৌড়াতে গিয়ে আঁকার ঠিক পাশেই পড়ে গেলাম। ভাগ্যিস ঢেউ ভিজিয়ে দেয়নি। আমাকেই এঁকেছে। কী সুনিপুণ, নিখুঁত! এর আগে নিজেকে কখনোই এত নিখুঁতভাবে উপলব্ধি করিনি।
তাকে অদূরে দেখা যাচ্ছে। একটু পরপর পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে। ব্যাগ থেকে দুরবিনটা বের করে তাকাতেই সে আবারও আমার চোখের সামনে চলে এল। সে হাসছে। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। হাত দিয়েও কিছু ইশারা করছে। ইশারা অনুযায়ী বালু খুঁড়তেই একটা ভিজিটিং কার্ড খুঁজে পেলাম। কার্ডের পেছনে লেখা, ‘দুরবিনে চোখ রাখব। আগামীকাল ঠিক সকাল ছয়টায় কবিতা চত্বরে…।’
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা