সিনেমা দেখতে বসে আমরা সাধারণত গল্প অনুসরণ করি। কিন্তু খুব কম সিনেমা আছে, যেখানে গল্প আমাদের অনুসরণ করতে শুরু করে। ‘দম’ আমার কাছে ঠিক সেই অভিজ্ঞতা।
একটা আতঙ্ক, শঙ্কা, বিজয়ের প্রত্যাশা নিয়ে সিনেমাটি দেখা শেষ করলাম। আকর্ষণ অনুভব করি সিনেমার ট্রেইলার দেখে। কে কে দেখব, কাকে নিয়ে দেখব—এসব হিসাব–নিকাশ করে নিজে শেষে একাই দেখে ফেললাম। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন আফরান নিশো। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এত চমৎকারভাবে চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলেছেন এবং ছবির প্রতিটি দৃশ্য অসাধারণ। মনে হচ্ছিল, আমি ওই দৃশ্যের জায়গাটায় চলে গিয়েছি! দেখতে দেখতে হয়রান লাগছিল...আহা, কী হবে!
মনোযোগ একবারও ভাঙেনি। গল্পটা শুধু পর্দায় চলছিল না, মনের ভেতরেও চলছিল। কী যে চমৎকার নির্মাণ। এই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এর মানসিক টানাপোড়েন। বাহ্যিক ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ভেতরের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থাটা। যেন প্রতিটি চরিত্র নিজের জীবনের ভেতর আটকে থাকা একেকটা মানুষ; বেঁচে আছে, কিন্তু পুরোপুরি শ্বাস নিতে পারছে না।
আফরান নিশো এই সিনেমায় শুধু অভিনয় করেননি, তিনি যেন চরিত্রটার ভেতরে বাস করেছেন। তাঁর চোখের ক্লান্তি, আতঙ্ক, বাঁচার আকুতি—সবকিছু এত বাস্তব যে আমি নিজেই শ্বাস আটকে ফেলতে বাধ্য হই।
চঞ্চল চৌধুরী আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি অভিনয়ের স্কুল। তাঁর উপস্থিতি দৃশ্যকে শুধু এগিয়ে নেয় না, মানসিক গভীরতাও তৈরি করে। আর পূজা চেরী চরিত্রে এনেছেন আবেগের মানবিক স্পর্শ, যা পুরো গল্পকে হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
অনেক দৃশ্য দেখে বারবার মনে হয়েছে, এটা কি সত্যিই আমাদের দেশের চলচ্চিত্র?
নির্মাণ, ক্যামেরার ভাষা, সিনেমাটোগ্রাফি, সাউন্ড ডিজাইন, টেনশন বিল্ড-আপ—সবকিছু আন্তর্জাতিক মানের। আর নির্মাতা হিসেবে রেদওয়ান রনি অসাধারণ করেছেন। তিনি শুধু গল্প বলেননি, দর্শকের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রতিটি দৃশ্য এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যেন আমরা চরিত্রের ভেতরে বন্দী হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আসলে মানুষের মানসিক শ্বাসরোধের অভিজ্ঞতা নির্মাণ করেছেন। ওনার নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে বড় শক্তি—তিনি ঘটনাকে নয়, মানুষের অনুভূতিকে ফ্রেমে ধরেছেন।
ক্যামেরা মুভমেন্ট এমন ছিল, যা উদ্বেগ তৈরি করে। নীরবতাই ভয়ের ভাষা হয়ে উঠেছিল। যখন ক্লোজ শটগুলো দেখাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল আমি চরিত্রের মানসিক বন্দিত্বে ঢুকে গিয়েছি। মানসিকভাবে গল্পের দুনিয়ায় ঢুকে গিয়েছিলাম।
সাইকোলজিক্যালভাবে এই সিনেমা আসলে ‘শ্বাস’ নিয়ে বেঁচে থাকা আর টিকে থাকার পার্থক্য। মানুষ কতটা চাপ, ভয়, ট্রমা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও আশা ধরে রাখে, সেটার এক গভীর মানসিক অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে বড় কথা হলো—অনেক দিন পর এমন একটি বাংলা সিনেমা দেখলাম, যেখানে গল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু অনুভূতি শেষ হয়নি।
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ