কিছুটা কাল্পনিক

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

শিল্পকলা একাডেমির ঠিক সামনে অনেকগুলো পুরোনো বইয়ের দোকান। সহপাঠীদের কারও কারও দোকানগুলোতে যাতায়াত থাকলেও আমার নেই। প্রতি সেমিস্টারের প্রয়োজনীয় বই, খাতা মাসি কিনে দেন। তিনি চাকরি করেন। আমরা মামার বাড়িতে থাকি। মাসি বিয়ে করেননি। আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। তাঁর মতের বাইরে যাই, পছন্দ করেন না। মনে আছে, কোচিংয়ে ক্লাস নিতে যাব শুনে আপত্তি করার পরও যেতে চাওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।

মাসি একটু রাগী। আমাকে সব সময় চোখে চোখে রাখেন। মা–বাবা, মামারাও তাঁকে গুরুত্ব দেন। তাঁর একটা দুঃখময় অতীত আছে। একজনকে ভালোবাসতেন; সম্পর্কটা পরিণতি পায়নি। মাঝেমধ্যে মাসির সঙ্গে গল্প জমাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তিনি বেশি কথা পছন্দ করেন না। সব সময় নিজের মতো থাকেন, বই পড়েন। বই উপহার দিলে খুশি হন।

সামনে মাসির জন্মদিন, ১০ জুলাই। উপহার দেওয়ার জন্য বই কিনব। আমাদের শহরে সব ধরনের বই সব সময় পাওয়া যায় না। লাইব্রেরিগুলো ঘুরে একপ্রকার হতাশ হয়ে ক্যাম্পাসের বটতলায় গিয়ে বসলাম। সঞ্চিতা আগে থেকেই ওখানে ছিল। কথায় কথায় সে বলল, পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোতে দেখতে পারিস। কখনো কখনো সাহিত্যের দারুণ সব কালেকশন মিলে যায়। তার চেয়েও বড় কথা প্রায় অর্ধেক দামে পাওয়া যায়। সঞ্চিতার কথা শুনে আর দেরি করিনি। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো ঘুরে মাসির পছন্দের লেখকদের বেশ কিছু বই কিনি। মাসি খুব খুশি হবেন, ভাবতেই বুকের ভেতর আনন্দের শিহরণ বয়ে যায়। বাড়ি পৌঁছে বইগুলো উল্টে-পাল্টে দেখতে শুরু করি। বুদ্ধদেব গুহর মাধুকরী হাতে নিয়ে প্রথম পাতা ওলটাতেই চোখ কপালে ওঠে।

‘পলাশ,

ভুলে যেও বিবর্ণ বিকেল
শোকার্ত দিনের উপকথা
মনে রেখ
সুন্দরের অনন্ত বৈভব।

—নীলু’

মাসির হাতের লেখা। নিচে তারিখ দেওয়া ১০.৭.৯৭। নিশ্চিত হতে আমাকে দেওয়া বইয়ে শুভেচ্ছা বার্তার সঙ্গে মিলিয়ে নিই। নীলাঞ্জনা চৌধুরী মাসির পূর্ণ নাম। দাদু আদর করে নীলু ডাকতেন। মাসির একটা বিশেষত্ব হচ্ছে, নিজের জন্মদিনে প্রিয় মানুষদের বই উপহার দেন। সাতানব্বই সালে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। পলাশ নামের মানুষটাই তার পছন্দের মানুষ। পাতা ওলটাতেই সংশয় মিলিয়ে যায়।

‘আজীবন তোমার ভালোবাসার মধুকর হয়ে কাটাতে চাই।

—অনিরূদ্ধ সরকার (পলাশ)
৪১, আরএন কলোনি, খুলনা।’

আমি এই ঠিকানা চিনি। বড় মামা যখন খুলনায় পোস্টিং ছিলেন। তখন আরএন কলোনির ৪০ নম্বর বাড়িতে থাকতেন। তার ঠিক পরের বাড়িটা ৪১ নম্বর বাড়ি। মাসির কাছে জানতে চাওয়া যাবে না। তা ছাড়া বাড়ির কারও সঙ্গেই বড়দের বিষয়ে কথা বলা নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, বড় হয়েছি কেন যে বুঝতে চায় না! আচ্ছা, কাল খুলনা গিয়ে ঘুরে এলে কেমন হয়। সঞ্চিতা কি যাবে? ফোন করতেই সে যেতে রাজি হয়।

পরের দিন সকালের ট্রেনে খুলনা পৌঁছাই। স্টেশন থেকে সাতরাস্তার মোড় হয়ে ডান দিকে গেলেই আরএন কলোনি। ৪১ নম্বর বাড়িতে গিয়ে হাজির হই। কলবেল চাপতেই সত্তর বছর বয়সের এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে সামনে দাঁড়ান। ‘কাকে চাই?’কোম্পানির একটি পণ্যের জরিপের জন্য এসেছি বলায় ভেতরে গিয়ে বসতে বললেন। কথা প্রসঙ্গে বাড়ির লোকজন কে কী করেন, কোথায় থাকেন জানতে চাই। সঞ্চিতা পাশে বসে উসখুস করছে। ভদ্রমহিলা অনেকের কথা বললেও অনিরুদ্ধ প্রসঙ্গে কিছু বলেন না। ‘অনিরুদ্ধ সরকার কোথায় থাকেন?’ হঠাৎ প্রশ্ন করি। ভদ্রমহিলা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। ‘পলাশ, সেই যে বিদেশ গেল আর ফিরল না। শুনেছি ওই দেশের মেয়ে বিয়ে করেছে।’ ওই মুহূর্তেই সঞ্চিতার হাত ধরে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাই। মনে মনে লোকটাকে ভর্ৎসনা করি। দুই চোখে মাসির ছবি ভেসে ওঠে। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বেড়ে যায়।

সাধারণ সম্পাদক, যশোর বন্ধুসভা