সদরঘাটের রাত, সাংবাদিকের খুন—কী লুকিয়ে আছে ‘কৃষ্ণ নদীর শহরে’

এস এম নিয়াজ মাওলার ‘কৃষ্ণ নদীর শহরে’ছবি: সংগৃহীত

জানেন তো? নিয়ন আলোয় মোড়া রাতের ঢাকার এক অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। আবার সেই রাতেই লুকিয়ে আছে নৃশংস কদর্যতা। প্রদীপের নিচের জমাটবাঁধা আঁধার যেমন।

‘কৃষ্ণ নদীর শহর’ বলেই কি এমন?
সদরঘাট—যেখানে দিনরাত মানুষের ভিড় জমে থাকে। ছিনতাই করলে, চুরি করলে, কাউকে খুন করেও ফেলে রাখলে কেউ দেখে না, দেখলেও কেউ কিছুই করে না, বলে না। বলতে চায় না, কিংবা বলতে দেওয়া হয় না।
ঠিক এমন এক রাতে সদরঘাটে খুন হন সাংবাদিক মোস্তাফিজ। কেন গিয়েছিলেন তিনি অত রাতে সদরঘাটে?

ক্রাইম সিন খুব গোছানো। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা রাশেদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বুঝতে পারেন, এই তদন্ত তাঁকে কোনো বড় সাম্রাজ্যের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, যার ভিত নাড়ালে কেঁপে উঠবে অনেক কিছু।

মোস্তাফিজ প্রথম জীবনে অডিটর ছিলেন। কিন্তু সংখ্যার খেলা ছেড়ে ঠিক কবে শব্দের খেলায় পা রাখলেন, সেটা জানা নেই। তাঁর লাশের কিছু দূর থেকে পাওয়া যায় একটা এনক্রিপটেড পেনড্রাইভ। পেনড্রাইভ কার হাতে পড়ল?
মোস্তাফিজের বন্ধু সাংবাদিক নাফিসাকে মৃত্যুর আগে বলে যান, ‘কৃষ্ণ নদীর পাড়ে নিজেকে খুঁজে নিতে’। কিন্তু পুরো কথা বলে যাননি।

এর মধ্যে উঠে আসে ‘প্রজেক্ট নিঝুম’-এর নাম। গুলিস্তানের অন্ধকার এক ঘর থেকে মেলে তার অস্তিত্বের ইঙ্গিত। কিন্তু এই প্রজেক্ট কী? মোস্তাফিজের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায়?
পুলিশ কর্মকর্তা রাশেদ আর তানভীর ছুটছেন শহরের এমাথা থেকে ওমাথা। লক্ষ্য মোস্তাফিজের খুনের রহস্য আর কৃষ্ণ নদীর শহরের রহস্য বের করা।
কিন্তু কে যেন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে রাখছে, টের পাচ্ছে সব আগেই। কেউ যেন ধরা না দিতে চাইলেও ইচ্ছা করে ফেলে যাচ্ছে সূত্র, যেন ধরা পড়ার ভান করছে।

অন্য দিকে ইমতিয়াজ সাহেবের বিশাল সাম্রাজ্য—কিছু প্রকাশ্য, কিছু গোপন। দিনের আলোতে যার এক রূপ, রাতের আঁধার নেমে এলে কি বদলে যায় সব?
এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা বড় ছেলে রায়হানের। উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়ার কথা তার। কিন্তু রায়হান ঘর ছাড়ে। ছোট ছেলে আরিফ যেন ভিন্ন এক জগতের বাসিন্দা। এই সাম্রাজ্যের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মোস্তাফিজের মৃত্যু? কিন্তু কীভাবে?

সাংবাদিক নাফিসা, এ মেয়ে এক রহস্য। মোস্তাফিজ মৃত্যুর আগে তাকে জানিয়ে গিয়েছিল, কোথায় খুঁজতে হবে তাকে। দিয়ে গিয়েছিল এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভের ক্লু। বইয়ের এত শক্তিশালী চরিত্র, উপস্থিতি হতাশাজনকভাবে কম।

আরও পড়ুন

হালকা ধাঁচের থ্রিলার। ছোট ছোট বাক্য, এনক্রিপশন আর ডেটা রিট্রিভের অংশগুলো ভালো। তবে বেশি সাসপেন্স নেই, অনেক কিছু আগেই আন্দাজ করা যায়। পাসওয়ার্ডও সহজ, এটা ইচ্ছাকৃত কি না জানি না! এত সহজে অনুমান মিলে গেলে মজা কই?

বইটির শক্ত চরিত্র নাফিসা। তাকে আরও বেশি সময় দিলে ভালো হতো। রাশেদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অস্বস্তিটুকুও আরও কাজে লাগানো যেত। আর মোস্তাফিজের পরিচয়ে একটা ছোট ভুল—এক জায়গায় তাকে ‘ব্যাংকার’, আবার ‘অডিটর’ বলা হয়েছে, যা টাইপিং মিসটেক কিংবা বোঝার ভুল।

ইমতিয়াজ, রায়হান, আরিফ—এরা সময়ের প্রয়োজনে এসেছে। কিন্তু আরও চরিত্র আছে, যাদের উপস্থিতি কম। ‘প্রজেক্ট নিঝুম’ রহস্যসহ আরও বেশ কিছু অংশে গুরুত্ব দিলে গল্প আরও জমত।

মোট কথা, বইয়ের কলেবর বাড়ানো যেত, দরকার ছিল। প্রতিটি অংশে আরও সময় দিলে উপন্যাসটা আরও সমৃদ্ধ হতো। তারপরও যাঁরা হালকা ধাঁচের থ্রিলার পড়তে চান, তাদের জন্য ‘কৃষ্ণ নদীর শহরে’ এক বসায় পড়ার মতো গল্প।
তাহলে দেরি কেন? চলুন ঘুরে আসি কৃষ্ণ নদীর শহর থেকে।

একনজরে
বই: কৃষ্ণ নদীর শহরে
লেখক: এস এম নিয়াজ মাওলা
প্রকাশনী: বিবলিওফাইল প্রকাশনী