মহাষ্টমী আজ। বাপি রেডি হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাবে। একটি মেসেজ এসেছে মুঠোফোনে। ‘সন্ধ্যার আগে বাইরে বেরোনো ঠিক হবে না। বিপদ হতে পারে।’ অপরিচিত নম্বর। পাত্তা দেয় না বাপি। বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়।
যশোর শহরের পূজার মাঠসহ কয়েকটি মন্দির ঘুরে সুধীর বাবুর কাঠগোলায় যায় তারা। কাঠগোলার পূজার ঐতিহ্য আছে। দারুণ সাজসজ্জা চারপাশে। তন্ময় ক্যামেরায় একে একে ছবি তুলছে। বাপি দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। ‘ছেড়ে দেওয়া ভালো, না অপেক্ষা করা?’ কথাটা যে জিজ্ঞাসা করে, তার চুল উসকোখুসকো, পরনে লুঙ্গি আর কালো রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি। বাপি তার দিকে ফিরতেই হাত কামড়ে ধরে সে। বাপি ‘ছাড়, ছাড়’ বলে চিৎকার করলে শুভঙ্কর দৌড়ে আসে। একটা লাঠি হাতে নেয়। পাগলটা সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যায়।
আবারও মুঠোফোন বেজে ওঠে। মেসেজ। ‘আগুন থেকে সাবধান। বিপদ আসন্ন’। বাপি চায়ের দোকানের উনুনের একেবারে কাছের বেঞ্চে বসে ছিল।
বড় রাস্তার পাশের একটি মেডিসিন স্টোর থেকে হাত পরিষ্কার করে বাপিরা রামকৃষ্ণ আশ্রমে যায়। মন্দিরে প্রণাম করে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে। শানবাঁধানো ঘাট। সবাই মিলে ছবি তোলে। বেরোনোর সময় শহরের একটি কলেজের শিক্ষকের সঙ্গে দেখা। তাঁর কাছে পদার্থবিদ্যা পড়ত জ্যোতির্ময়। কুশল বিনিময় শেষে বাপির মুঠোফোন বেজে ওঠে। মেসেজ এসেছে। ‘যাত্রাপথে ইজিবাইক পরিহার করতে হবে আজ। না হলে ঝামেলা হতে পারে।’ বাপি গুরুত্ব দেয় না। কেউ ফাজলামি করছে ভেবে এড়িয়ে যায়।
আশ্রমের গেটের সামনে ইজিবাইকের অপেক্ষায় তারা। একটি ইজিবাইক এসে থামে। ‘টার্মিনাল যাব। ছয়জন, কত নেবেন?’ জিজ্ঞাসা করলে, বেশি ভাড়া চাওয়ায় ‘যাব না’ বলে জ্যোতির্ময়। পরে তিনজন করে দুটি রিকশায় ওঠে। রেললাইনের কাছাকাছি যেতেই দেখে, ইজিবাইকটাকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। চালকের হাতে হ্যান্ডকাফ। জটলার ভেতর থেকে একজন বলে, ‘চোরাকারবারী, মামলা ছিল, তাই ধরছে।’ ‘ভাগ্যিস বেশি ভাড়া চাইছিল। ওর বাইকে উঠলে ঝামেলা হতো। পূজাটাই মাটি হয়ে যেত।’ জ্যোতির্ময়ের জবাব। রিকশায় বসে মেসেজ দুটো আবার পড়ে বাপি। ভয়ে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে। সত্যিই কি কোনো বিপদ ঘটবে আজ? মনে মনে দুর্গতিহারিণীর কাছে প্রার্থনা করে।
তাদের গন্তব্য খুলনা। গিয়ে শহরের পূজা দেখবে। ১৫ মিনিট পর গাড়ি ছাড়বে। টার্মিনালের বড় আমগাছের নিচে বেঞ্চের ওপর বসে চায়ের অর্ডার দেয় বাপি। লাল্টু মামার চায়ের সুখ্যাতি যশোরজুড়ে। আবারও মুঠোফোন বেজে ওঠে। মেসেজ। ‘আগুন থেকে সাবধান। বিপদ আসন্ন’। বাপি চায়ের দোকানের উনুনের একেবারে কাছের বেঞ্চে বসে ছিল। একলাফে উঠে সামনের বেঞ্চে শুভঙ্করের পাশে গিয়ে বসল। ঝকঝকে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করে। ওরা প্লাস্টিকের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাসে ওঠে। হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। চায়ের দোকানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে। আশপাশের সবাই ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। মেসেজের কথা মিলে যাচ্ছে। বেঞ্চের ওপর বসে থাকলে কী হতো? ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে। নম্বরটাতে কল করে বাপি। কল যাচ্ছে না।
গাড়ি ছুটে চলেছে। ‘আমার কাজ আছে। তোরা যা, পরের গাড়িতে আসছি আমি।’ বলল শিব সিংহ। ‘কাজ সব খুলনায় গিয়ে করবি।’জ্যোতির্ময়ের জবাব। মিস্টার সিংহ নাছোড়বান্দা। বাস যাত্রী তুলতে দাঁড়ালে নেমে যায় সে। ‘গাড়ি যে গতিতে চালাচ্ছে, অ্যাক্সিডেন্ট করলে ও বেঁচে গেল। আর আমরা সবাই…।’ পাপ্পা বললে বাপি রেগে যায়। কথা–কাটাকাটি হয় দুজনের মধ্যে। পরিস্থিতি শান্ত করে শুভঙ্কর ও জ্যোতির্ময়।
খুলনায় পৌঁছে শহরের কয়েকটা পূজা দেখে বিএল কলেজে যায় তারা। মিস্টার সিংহও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। কলেজ গেটের বাঁ পাশে ঝালমুড়ির দোকানে বেশ ভিড়। ‘ইউটিউবে সার্চ দিলেই পাবা। এই ঝালমুড়ি বিখ্যাত। খেতে হবে।’ বলে তন্ময়। কলেজের মন্দিরে পূজা হয়। গেট পার হয়ে ভেতরে ঢুকতেই আবার মেসেজ, ‘ বিপদ কেটে গেছে…।’ আগেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এক বড় ভাইকে নাম্বারটা পাঠিয়েছিল বাপি। আবারও হোয়াটসঅ্যাপে নক করে। ‘নম্বরটা এক সহকর্মীকে দিয়েছি। আপডেট পেলে জানাচ্ছি।’ মেসেজ বক্স চেক করে বাপি। মেসেজগুলো নেই। হাতের চাপ লেগে কি ডিলিট হয়ে গেল! কী হচ্ছে আমার সঙ্গে? মন্দিরে পৌঁছে গেছে ততক্ষণে। মাথা উঁচু করে সামনে তাকায় সে। মা দুর্গার মুখ আলোয় ঝলমল করছে। বক্সে গান বাজছে, ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।’বাপির চোখ জলে ভরে ওঠে।