ক্লাসের বাইরে বেঞ্চে বসে আছে মাহাদী। তার পাশেই বসে দুষ্টমি করছে সুজন ও সজিব। তাদের আগে দেখলে সে অবশ্য এখানে বসত না। বোর্ডিং স্কুলে আজ তার তৃতীয় দিন। গত দুই দিনেই সে চিনে ফেলেছে ওদেরকে। দুষ্টের হদ্দ। এখানে আসার পর কারও সঙ্গেই তেমন কথা হয়নি। গতকাল ফাহিম নামের একটা ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তা–ও নাম–পরিচয় জেনেই শেষ। মায়ের সঙ্গেও কথা হয়নি খুব একটা। মা চলে যাওয়ার আগে বার কয়েক নাম ধরে ডেকেছিল। কিন্তু মাহাদী সাড়া দেয়নি। ফিরেও তাকায়নি পেছন দিকে। সে জানে মা হয়তো চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির দিকে গেছে।
আগেও সে দুবার এসেছে এই বোর্ডিংয়ে। মায়ের সঙ্গে। মা তাকে এখানে রাখার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল। প্রতিবারই ভেতরে এলে কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। কিন্তু সে মাকে বলেনি। বলে কোনো লাভ হতো না। মা এখানেই পাঠাত। মাহাদীর বাবা নেই। ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছিলে বলে মনে হয়। কিন্তু বাবা কেমন ছিলেন, সেটা স্পষ্ট স্মরণ করতে পারছে না। বাবার সঙ্গে তার কোনো মজার স্মৃতিও নেই। মায়ের কাছ থেকে শুধু গল্প শুনেছে।
একটু পরেই টিফিন টাইম শুরু হবে। স্যার ছিলেন না বলে টিফিনের আগের ক্লাসটাও হয়নি। ছেলেপুলেরা হল্লা করছে মাঠের মধ্যে। বেঞ্চি ছেড়ে গাছতলায় ঘাসের ওপর এসে বসে মাহাদী। তার খুব করে মনে পড়ছে ছাদের বাসাটার কথা। ছোটবেলা থেকেই সে তাদের এই একটি বাসাই দেখে আসছে। বাসা পাল্টানো হয়নি কোনো দিন। ছোট একটি কামরা। পাশেই উঠানের মতো বিশাল ছাদ। মায়ের সহায়তায় কয়েকটি ফুলের গাছও লাগিয়েছে ছাদে। ঝুম বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত বৃষ্টি দেখত। ভরা পূর্ণিমার রাতে গল্প শুনত মায়ের কোলে বসে। মা বাইরে কোথাও গেলেও মাহাদী একাই থাকত বাসায়। আবার কবে মাকে দেখতে পারবে? খুব করে মায়ের কথা মনে পড়ছে। এই প্রথম সে মাকে ছাড়া থাকতে শুরু করেছে। ভাবতে ভাবতে চোখে জল চলে আসে তার। জোরে ঘণ্টার শব্দ শুনে চোখ মুছতে মুছতে ক্লাসে চলে যায় মাহাদী।
হাটহাজারী, চট্টগ্রাম