হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে আলাদা একটা দুর্বলতা আছে। এখন পর্যন্ত তাঁর লেখা পড়া বইয়ের সংখ্যা ১৫৩। ‘কিছুক্ষণ’ বইটি পড়েছিলাম ২০১৫ সালে। সেই গল্প থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে পরিচালক তামিম নূর নির্মাণ করেছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।
গল্পের শুরু হয় কিছু অচেনা মানুষের গল্প দিয়ে। ট্রেনযাত্রার ভেতরে নানা ঘটনা, বিপদ, আবেগ আর পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গল্পটি এগিয়ে যায়। পুরো সিনেমাটা এক রাতের গল্প, যা দেখতে দেখতে সময় কীভাবে চলে যায়, বুঝাই যায় না। এ জায়গায় সিনেমাটি আমাকে ভারতীয় সিনেমা ‘কিল’-এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
সিনেমাটির অন্যতম শক্তি এর সংগীত। আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে, আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে’ নতুনভাবে গেয়েছেন আহমেদ হাসান সানি। তিনি একজন আন্ডাররেটেড শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে একটা ভিন্ন আবহ আছে, যা শুনলে কলকাতার আর্ট ফিল্মের গানের অনুভূতি পাওয়া যায়। এ সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহার সত্যিই দারুণ লেগেছে।
পরিচালক তামিম নূর সিনেমাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দর্শককে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করবে। স্ক্রিনপ্লে, চরিত্র নির্মাণ ও সংলাপ—সবকিছুই ছিল প্রাণবন্ত।
সিনেমাটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাও ছিল। একজন ডাক্তার তার মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ট্রেনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তাকে সেই সিদ্ধান্ত নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আবার এক মন্ত্রীর ক্ষমতা হারানোর পর আশপাশের মানুষ, এমনকি আত্মীয়স্বজনের আচরণ কীভাবে বদলে যায়, সেটাও খুব বাস্তবভাবে দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে একটি সামাজিক ট্যাবু ভাঙার বিষয়টি। একজন পুরুষ ডাক্তার ডেলিভারি রোগী দেখতে পারবেন না—এমন ধারণাকে সিনেমাটি সুন্দরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের বন্ধুত্ব, প্রেম, স্বপ্ন আর সংগ্রামের গল্পও খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিরিয়াস পরিস্থিতির মধ্যেও যে দারুণ রসবোধ তৈরি করা যায়, সেটাও সিনেমাটি দেখিয়েছে। বিশেষ করে মোশাররফ করিম তাঁর অভিনয়ে বরাবরের মতোই অসাধারণ ছিলেন।
সব মিলিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ শুধু একটি ট্রেনভিত্তিক গল্প নয়; এটি মানুষের সম্পর্ক, সমাজের বাস্তবতা, আবেগ আর জীবনের নানা স্তরকে একসঙ্গে তুলে ধরা একটি চমৎকার সিনেমা।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা