ঘা (প্রথম পর্ব)

ছবি: এআই/বন্ধুসভা
এতক্ষণ অদ্ভুত সব চিন্তার মধ্যে এ বিষয়টা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম যে আমার স্ত্রী শারমিন একজন ডাক্তার।

শেষ রাতে কলিং বেলের টুংটাং শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। রাতে অনেকটা দেরিতে ঘুমিয়েছিলাম। কলিং বেলটা বাজার আগে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়েছি। তাই বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। রাতের এই অতিথিকে বরণ করার জন্য এখন বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে ভেবেই, বিরক্তির মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়তে লাগল। নিজে না উঠেও উপায় নেই। এই বাড়িতে মানুষ বলতে শুধু আমিই। শারমিন ওর বাবার বাড়িতে গেছে আজ দুই দিন। ওর মা অসুস্থ।

ঘুম ঘুম চোখে সাইড টেবিলে হাত দিয়ে ল্যাম্পটা জ্বালালাম। দেয়ালঘড়িতে দেখলাম, রাত চারটা বাজতে ছয় মিনিট বাকি। ঘুমানোর সময় দেখেছিলাম, দুইটা বেজে সাত। তার মানে, ২ ঘণ্টার চেয়ে ১৩ মিনিট কম ঘুমিয়েছি।

এত রাতে কে আসতে পারে? শারমিনের মায়ের কি উল্টাপাল্টা কিছু হয়ে গেছে? খুব খারাপ কিছু? কিন্তু তাহলে নিশ্চয়ই মাকে ফেলে রেখে শারমিন এখানে ছুটে আসবে না। একটা ফোন করে আমাকে জানিয়ে দিলেই হবে কিংবা শারমিন ভাবির সঙ্গে ঝগড়া করে কি ফিরে এল? না, সেটাও হওয়ার কথা নয়। সে এতটা ছেলেমানুষি করার মতো মেয়ে নয়। ভাবির সঙ্গে ঝগড়া করে ভোররাত চারটার সময় যে বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে নেই, কাজটা যে যথেষ্ট অশোভন—এই জ্ঞান অন্তত ওর আছে। তাহলে কে? আমার কোনো মাতাল বন্ধু? কলেজে পড়ত, যার কাছ থেকে আমি টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিইনি! আজকে গলায় মদ পড়ে সেই কথা মনে হয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আমার বাড়ি এসে কলিং বেল চাপছে সেই কলেজে ধার নেওয়া ১০০, ২০০ বা ৫০০ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য; যাতে তার আরও দুই দিন এমন তরল স্বর্গসুখ মেলে! কিংবা তার সাবেক প্রেমিকা, যে তাকে ছেড়ে আমার কাছে চলে এসেছিল; কিংবা শারমিনের কোনো সাবেক প্রেমিক, যাকে ঠকিয়ে শারমিন আমার সংসারে এসেছে; তাদের কেউ কি হতে পারে?

বহু কষ্টেও কলেজজীবনে কোনো টাকা ধার নেওয়ার ঘটনা মনে করতে পারলাম না। আমার বাবার অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল। বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কলেজজীবনে কোনো প্রেমও করিনি। একটা মেয়েকেই ভালো লাগত, কিন্তু কখনো তাকে বলার সাহস পাইনি। শারমিনও তার অতীত আমাকে বলছে। একটা ছেলের সঙ্গে তার মাস দুয়েকের সম্পর্ক ছিল, তবে সেটা নষ্টও করেছে ছেলেটাই। মাস দুয়েক পরে ওর নাকি শারমিনকে আর ভালো লাগত না, তাই ছেড়ে দিয়েছিল। তাহলে সেই ছেলেও তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে কে? কোনো ডাকাত? কোনো খুনি? কোনো ধর্ষক? কে?

দুই ফিতার একটা স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে গেটের দিকে রওনা দিলাম। আমার অতিথি অসময়ের হলেও তার বিবেচনা ও বুদ্ধি বেশ ভালো। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে বারবার বেল চাপছে না। অনেকক্ষণ আগে একবার চেপেছিল। তারপর আমি নিচতলায় নেমে আরেকবার বেলের আওয়াজ শুনতে পেলাম। এর মধ্যে গায়ে একটা পাঞ্জাবি গলিয়েছি, চোখেমুখে পানি দিয়েছি। তারপর স্যান্ডেল খুঁজে বের করে সেটা পায়ে দিয়ে নিচে নামছি। মাঝখানে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়েছে।

অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য গেট খুলে দিলাম। একটা মেয়ে, বয়স প্রায় ২১–২২। রোগা–শীর্ণ ধরনের চেহারা নিয়ে আমার সামনে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন এ দুনিয়ায় যত অপরাধ হচ্ছে, সব দায় তার। ফিলিস্তিনে বোমা হামলা, আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ, আমেরিকার আগ্রাসন থেকে শুরু করে ঘুষ খেয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের পেটে চর্বি জমানো, বিশ্বস্ত প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমিকার বেইমানি—সব ঘটনার দায়ভার যেন সে বহন করছে। এসব যেন ঘটেছে তারই নির্দেশে!

‘এইডা কি দাকতার (ডাক্তার) সাবের বাড়ি?’
মেয়েটার পাশ থেকে একটা ভয়াবহ কর্কশ গলায় কথাটা ভেসে এল। সঙ্গে যে আরেকজন আছে, তা প্রথমে খেয়াল করিনি। কণ্ঠ শুনে সেদিকে ফিরে তাকালাম। মেয়েটার সঙ্গে একজন নারীও এসেছে। মোটাসোটা গড়নের। এই মেয়ে যদি তার নিজের সন্তান হয়, তাহলে তার ওপর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলা যেতেই পারে। মেয়েকে না খেতে দিয়ে কি কোনো মা খেতে পারে? তাহলে এমন মোটাতাজা গড়নের নারীর মেয়ে অমন জীর্ণশীর্ণ হবে কেন!
নারী সম্ভবত মনে করেছে, আমি তার কথা শুনতে পাইনি। তাই কণ্ঠে আরও জোর দিয়ে আবার জানতে চাইল, ‘এইডা কি দাকতার (ডাক্তার) সাবের বাড়ি?’

এতক্ষণ অদ্ভুত সব চিন্তার মধ্যে এ বিষয়টা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম যে আমার স্ত্রী শারমিন একজন ডাক্তার। এত রাতে আসা অতিথি যে রোগী হতে পারে, এই সাধারণ বিষয়টা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। হয়তো ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে ওঠার কারণে বিষয়টা ঘটেছে। কিন্তু কোথাও একটা সমস্যা মনে হলো আমার কাছে। শারমিনের এই রোগীরা সম্ভবত ডাক্তারকে চেনে না। যদি চিনত, তাহলে নিশ্চয়ই ‘ডাক্তার সাব’ বলত না। কারও কাছে হয়তো শুনেছে, এটা ডাক্তারের বাসা। অতটুকুই।

অনায়াসে বলে দিতে পারতাম যে আপনাদের ডাক্তার বাসায় নেই, আমি ওনার স্বামী। আপনারা অন্য এক সময় আসবেন। কিন্তু দুটি কারণে তাঁদের প্রতি তীব্র কৌতূহল অনুভব করছিলাম। প্রথম কারণ, মেয়েটা কেন এতটা জীর্ণশীর্ণ? তার মধ্যে এতটা অস্বাভাবিকতা কেন? দ্বিতীয় কারণটা আরও জোরালো। আমার স্ত্রী চর্মরোগের ডাক্তার। চর্মরোগ এমন কোনো প্রাণঘাতী রোগ নয় যে ডাক্তারের বাড়ি খুঁজে ভোররাত চারটার সময় চলে আসতে হবে। অবশ্য শারমিন কিসের ডাক্তার, সেটা যে তারা জেনে এসেছে, এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে তাদের দুজনের কাউকেই গুরুতর অসুস্থ বলেও মনে হচ্ছে না। তাহলে এত রাতে এল কেন?

কৌতূহলকে অনেকটা কষ্ট করেও দমাতে পারলাম না। ওনাদের কাছে নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দিলাম, তারপর শারমিনের চেম্বারের দরজা খুলে বসতে বললাম। শারমিন এমনিতে বাসায় রোগী দেখে না। তবে বাইরের একটা ঘরকে চেম্বারের মতো বানিয়ে রেখেছে। সেখানে ছুটির দিনে দুই–একজনকে দেখে। ওদেরকে সেখানেই বসালাম।

যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে ডাক্তারের অভিনয় শুরু করলাম। কলেজজীবনে কিছুদিন মাথায় অভিনয়ের ভূত চেপেছিল। কলেজজীবনে যা হয় আরকি, সবাই নিজেকে শাহরুখ খান, সালমান খান ভাবতে শুরু করে। আমারও তেমনি হয়েছিল। বেশ কয়েক দিন ঘুরে একটা থিয়েটারে ছোট একটা চরিত্রেও কাজ করার সুযোগ পাই। অভিনয়ের সেই অভিজ্ঞতা আছে। তা ছাড়া নিজের ওপর বিশ্বাস আছে, এইটুকু ডাক্তারের অভিনয় করতে পারব।

‘আপনাদের মধ্যে রোগী কে?’
‘জ্বি আমি।’ মেয়েটা উত্তর দিল।
‘আপনি তাহলে এদিকে এই চেয়ারে এসে বসুন।’
আমি শারমিনের চেয়ারে বসেছিলাম। ওরা বসেছিল একটু দূরে একটা সোফায়। বলার পরে মেয়েটা আমার পাশে চেয়ারে এসে বসল।
‘কী সমস্যা আপনার?’
মেয়েটা তার ফ্যাকাশে হাত দুটি সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর জামার আস্তিনটা একটু গুটিয়ে বাঁ হাতের ক্ষতস্থানটা দেখাল। একটা কেমন যেন ফোসকা পড়ার মতো ক্ষত দেখতে পেলাম হাতের দুই–তিন জায়গায়। তার মানে, শারমিন যে চর্মরোগের ডাক্তার, সেটা এরা জানে। কিন্তু ডাক্তারের নাম কী বা ডাক্তার ছেলে, না মেয়ে—এসব কিছুই জানে না। যার কাছে শুনেছে, সে হয়তো শুধু বলেছে, এখানে একজন চর্মরোগের ডাক্তার থাকেন। মেয়েটা এরপর ওর ডান হাত দেখাল। সে হাতেও ক্ষত কয়েক জায়গায় আছে। খেয়াল করে দেখলাম, গলার ওদিকেও এক জায়গায় ঠিক একই রকম ক্ষত।

নির্জীব চোখে ক্ষতগুলো দেখছি। একজন ডাক্তারের কি এভাবে দেখা উচিত? আমার অভিনয় কি ঠিক ডাক্তারের মতো হচ্ছে না? না হলেও কিছু করার নেই। মন পড়ে আছে সেই রহস্যের মধ্যে। কেন এরা এই সামান্য ক্ষতের চিকিৎসার জন্য এত রাতে এল! ওমন মোটাতাজা নারীর মেয়ে এত রোগা ও শীর্ণ কেন! এসবের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম যে ডাক্তারের অভিনয় করতে গেলে প্রতিষেধকের নাম জানাও জরুরি। মেয়েটা যখন তার অস্বাভাবিক কোমল স্বরে বলল, ‘ঘাও গুলান সারব ক্যামনে দাকতার সাব?’ মনে পড়ল, মেয়েটার সমস্যার কোনো প্রতিষেধক দেওয়া আমার নৈতিক কর্তব্য।
‘এ রকম কি শুধু হাতে আর গলাতেই আছে?’
প্রশ্ন শুনে মেয়েটা একটু সংকোচ বোধ করল। সে যে এই প্রশ্নে লজ্জা পেতে পারে, তা ভাবিনি। আমি শুধু ডাক্তারের অভিনয় করছিলাম। ডাক্তার হিসেবে তার পূর্ণ সমস্যার তদন্ত করা আমার দায়িত্ব।
মেয়েটা মেঝের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরকে আরেকটু নমনীয় করে বলল, ‘পায়ে আছে আরও কয়েকটা। আর কোমরে...।’
কথা শেষ করার আগেই ওর মা পেছন থেকে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘এখন লাজ, শরমে যেন মাইয়া আমার মুখ তুইল্যা চাইতেই পারতাছে না। যখন লাজ–শরম থাকনের দরকার আছিল, তখন তো সেইডার ধার ধারোস নাই। এখন আর লাজ–শরম কইরা কী হইব?’

হতবাক হয়ে নারীর দিকে চেয়ে আছি। তার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারিনি। মেয়েটা অপরাধীর মতো আমার দিকে তাকায়। তার মা এইমাত্র যে অশ্রাব্য কথাগুলো বলল, তার দায়ও সে নির্দ্বিধায় নিজের কাঁধে তুলে নিল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘তুমি বাইরে গিয়া বইয়া থাকো। আজেবাজে কথা কইয়া দাকতার সাবরে বিরক্ত কইরো না।’
‘বাইরে যামু কিয়ের লাইগা? যাতে তুই দাকতার সাবের লগে...’।
এবার আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। কৌতূহল মেটানোর খাতিরে এতটা সহ্য করা যায় না। নারী ক্রমেই ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করছিল। আমি রীতিমতো চিৎকার করে বলে উঠি, ‘আপনি বাইরে গিয়ে বসুন, প্লিজ।’

নারী একটু হকচকিয়ে যায়। একরকম ছুটে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দরজার কপাটের সঙ্গে একটা ধাক্কা খায়। কপাল চেপে ধরে বাইরে গিয়ে বসে। আমি কৌতূহল মেটানোর মোক্ষম সুযোগ পাই।
(চলবে...)

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়