আলোর কখনো হয় কি বিসর্জন
রাউজান উত্তর গুজরা গ্রাম থেকে চট্টগ্রাম শহরে ঘাটফরহাদবেগ মামার মেঝ ছেলের বাসায় চলে এসেছি
আমাদের মন্দিরের বাগানের ফুলগুলো সেদিন খুব কাঁদছিল
এই গাছগুলো মায়ের হাতে লাগানো
বধির আমি আর কোনো পাখির ডাক শুনতে পাইনি
গৃহদেবতা কালী মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারিনি
লালধুতি পরে ফুল আর মালায় রোজ সাজিয়ে তোলার খেলা শেষ হয়ে এসেছে
জন্মভূমি মায়ের পূজা আয়োজন আর করা হবে না আমার
আমার রক্ত মাংসের মাটির মায়ের আলো-বদন সেদিন খুব বিষণ্ণ
আমার বয়স বারো কি তেরো
ছোট ছোট দুই ভাই বোন
দালাল ঠিক হয়ে গেছে
বুকের ভেতর বিসর্জনের বাজনা
এই যে রোজ বিকেলে খেলতে যাওয়া পাথরঘাটা গির্জার মাঠ
বিকেল গড়ানো ঢং ঢং ঢং ঢং...গির্জার ঘণ্টা
চাকতাই-কর্ণফুলীর পাড়, সাম্পানের মাঝিদের ভিড়
লঞ্চ ছুটে গেলে দুপাশে ছড়িয়ে পড়া জলের আলপনা
আমার মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল, ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত...’
স্লোগানে বিমানবাহিনীর শপথ বাক্যের পোশাক
নিউমার্কেট-পোলার আইসক্রিম-গিটিংস কার্ড
সদরঘাট কালীবাড়ি, বলুয়ার দীঘির পাড় অভয়মিত্র মহাশ্মশান
লাল দিঘির মাছ, জে এম হলে আলোচনা সভা
শহীদ মিনার-খালি পায়ে একুশের ভোর
উল্টো দিকের মুসলিম হলের পাশে শহরের বড় লাইব্রেরি
ওপর তলায় বাংলা বই, নিচের তলায় ইংরেজি
এই সব কিছু ছেড়ে, এই সব কিছু ছেড়ে
কান্নাকে এবার গিলে ফেলতে হবে বৃষ্টির পানির মতো
নিয়াজ, ইমতিয়াজ, মুন্না, কুশন, টিপু, চম্পা, কলি, জুঁই, রাসেল, অ্যালভেন, এলিটা
পাথরঘাটা জাইল্যা পাড়ার বাসার প্রতিদিনের সকাল-বিকেলের সব বন্ধুরা
মামাতুতো, মাসতুতো, পিসতুতো সব ভাইবোনেরা
সবাইকে ফেলে এবার চলে যেতে হবে
চিরতরে, একেবারে চলে যেতে হবে
বুকের ভেতর বিসর্জনের বাজনা
ঠাকুরদার আমলের পুরোনো কালো স্যুটকেস
তার ভেতরে মায়ের দুইটা কাপড়, আমাদের তিন ভাইবোনের দু-এক জোড়া পোশাক
উনুনে রুটি ফুলছে
একটা রুটির ভেতরে চিনা কাগজে মোড়া একটা পাঁচ শ টাকার নোট
আধখাওয়া রুটি ভেবে যাতে কেউ বুঝতে না-পারে ওপরটা সুজি দিয়ে ল্যাপটানো
মা গুছিয়ে নিয়েছে টিফিন বাক্স, দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া শেষ পানির বোতল
আমরা বাসে চড়ে বসেছি
ছোট মামা, মায়ের দুই তিনজন ভাইপো বোনপো সকলের চোখে জল
আমরা কাঁদছি, মায়ের চোখে জল বাঁধ মানছে না
আত্মীয়রা উদ্বিগ্ন, দেশের সীমানা পেরিয়ে ঠিকঠাক যেতে পারব তো
আমাদের বুকে ভয়, আমাদের বুকে চড়া কষ্ট
বুকের ভেতর বিসর্জনের বাজনা
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে সীমান্ত
রাস্তার পর রাস্তা হেঁটে, মায়ের কোলে প্রতিবন্ধী বোন
আমার মাথার ওপর ঠাকুরদাদার পুরোনো স্যুটকেস
হাঁটতে না পেরে কেঁদে উঠে কখনো ভাই উঠে পড়ছে আমার পিঠে
কলমিলতা-দূর্বা ঘাস-কাঁটা লতা-কচুরিপানা জল পাঁক কাদা, বাতাস রৌদ্রের তেজ
দেশের লাল টকটকে গনগনে সূর্য পেরিয়ে
মাথার ওপরে গোটা পৃথিবীর সূর্য নিয়ে শৈশবের প্যাঁচ খেলা ভোঁকাট্টা ঘুড়ির মতো
আমরা সীমান্ত পেরিয়ে গেলাম
ছাদের অ্যানটেনার বাঁশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একসময় কত চেষ্টা করতাম ইন্ডিয়ার টিভি চ্যানেল ধরার
আজ সেই অ্যানটেনায় এসে যেন আটকে গেছে জীবনের ছেঁড়া ফাটা ঘুড়ি
অন্ধকার পৃথিবীর তাড়া খাওয়া দশভুজা মা আমার
নতুন করে বাঁচার তাড়নায় নিয়ে এসেছেন নতুন দেশে
শুরু হয়েছে দিবা-অস্ত আরও কঠিন লড়াই
হেরে যেতে যেতে মা বেঁচে উঠেছেন
বেঁচে উঠতে উঠতে মা মরে গিয়েছেন
এক আধপেটা খেয়ে আমাদের দিনগুজরান
মায়ের জন্য হাড়ির তলানিতেও কিছু লেগে থাকে না
মায়ের ছেঁড়া কাপড় আমাদের শীতের উপশম
ঝাড় জঙ্গল থেকে তুলে আনা এক একটা আস্ত কচুর আগা থেকে গোড়া
কীভাবে কোর্মা পোলাওয়ে পরিণত করা যায়
মায়ের হাত যশ ছাড়া কে আর জানত
মা বেঁচে ছিলেন
উদ্বাস্তু জীবনের কঠিনতর লড়াই করতে করতেও তিরিশ বছর বেঁচে ছিলেন
জীবনের শেষ দিনগুলো মানসিকভাবে চূড়ান্ত বিপর্যস্ত হয়ে বেঁচে ছিলেন
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে পালিয়ে পালিয়ে থাকার সময় টাইফয়েড
বিনা চিকিৎসায় বধির হয়ে গিয়েছিলেন
চোখের সামনে জন্মাতে দেখা নতুন স্বাধীন দেশে দুই–দুইবার ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া
নতুন জীবনে একের পর এক বিপর্যয়, বেঁচে ছিলেন
কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে আমরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে এসেছি
মায়ের হাতে শৈশবের দুধভাত একসময় পান্তার আলুনিতে পরিণত হয়েছে
মা তবু আমাদের পানার মধ্যেও ফুল হয়ে ফুটিয়ে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন
সরকারি হাসপাতালে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে তাঁর
উত্তরপাড়া শ্মশানে আগুনের ভেতরে বিসর্জন
দুচোখে আলোর জ্যোতি তবু দান করে গিয়েছেন
ওপারের আলো, এপারের আলো বুকের ভেতরে বিসর্জনের বাজনা
নদীর প্রবহমান ধারার মতো মায়ের আঁচল পতাকা
টালি ঘরে জল পড়ে, নিচে এক কোমর জল
মায়ের আঁচল তবু চিরজীবনের ছাতা
অপরাজেয় মা আমার, জন্মভূমি-কর্মভূমি-ধাত্রীভূমি মা আমার
আলোর কখনো হয় কি বিসর্জন?