শরতের নাম শুনলেই প্রথমে কল্পনায় উঁকি দেয় নীলাভ আকাশ, উড়ে চলা সাদা ধূসর মেঘ, এঁকেবেঁকে চলা খালের দুই পারের অসংখ্য কাশফুল। শরৎ এলেই বুঝি আকাশের নীল রং আরও বেশি গাঢ় হয়ে যায়। পেঁজা তুলার মতো নরম মেঘগুলো হয়ে ওঠে লোভনীয়। খুব ইচ্ছা হয় মেঘেদের মুঠোয় নিয়ে গায় মাখতে। ছোড়াছুড়ি করতে। এখনো দাঁত গজায়নি এমন বয়সের শিশুরা যেমন মুঠো ভরে নেয় মায়ের কোমল কৃষ্ণ লম্বা চুল, তারপর মুখে নেয়।
শরৎ এলেই মেঘের সঙ্গে স্মৃতিগুলো এসে ভিড় জমায় মনের আঙিনায়। এ যেন বহুদিনের জমে থাকা সব চিঠি একসঙ্গে নিয়ে এসেছে কোনো অপরিচিত বুড়ো ডাকপিয়ন। এক আকাশ মন খারাপ নিয়ে হতবিহ্বল হয়ে খুলতে থাকি সেসব পুরোনো চিঠির খাম। এই যে এত দিন হলো তবু ঝকঝকে সব স্মৃতি। স্কুল শেষে সবাই একসঙ্গে খালের পার দিয়ে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ কবিতা বলতে বলতে দৌড়ে চলছি, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,/ আজ আমাদের ছুটি।’ একদিন হুট করে সেই যে স্কুল ছুটি হলো, আর খোলার নাম–নিশানাও নেই। আচ্ছা বুড়ো দপ্তরিরই–বা কী হলো। আজ কত বছর হয়ে গেল ঘণ্টা বাজায় না। আচ্ছা, আর কোনো দিনই কি খুলবে না আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়। এত দিনে হয়তো ভীষণ নোংরা হয়ে আছে আমাদের ক্লাসরুম। শেওলা পড়ে গেছে খেলার মাঠে, কলতলায় আর গোপন পরামর্শের জায়গাগুলোতে।
শরতে ঢেউখেলানো কাশবনের পাশে বয়ে চলা খাল দিয়ে রংবেরঙের পালতোলা ডিঙির মতো খুব ধীরগতিতে, আমরা চলে এসেছি সেসব দিন থেকে অনেক অনেক দূরে। যেন আকাশের ওপারে। যেখান থেকে আর কোনো দিন ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফিরে আসার রাস্তাও জানা নেই। কে জানে কেমন আছে ঝালমুড়িওয়ালা, তহমিনা ম্যাডাম ও বৃদ্ধ মোতালেবের বাপ। লাঠি হাতে নিয়ে কুঁজো হয়ে বসে যে দেখত ছেলেপুলেদের বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস।
বিকেলে সাদা রঙের ওপর লাল, নীল ও সবুজ রঙের ডিজাইন করা একটা একতলা লঞ্চ আসত ঘাটে। আবার সকালে ছেড়ে যেত। নানুবাড়ি পাশের উপজেলায়। বছরে একবার আমরা দল বেঁধে বেড়াতে যেতাম। খেলাধুলা শেষে ক্লান্ত শরীরে যেমন তাকিয়ে থাকতাম লঞ্চটার দিকে; আর ভাবতাম—ইশ, কবে যে সেই সময়টা আসবে। আবার বেড়াতে যাব। ঠিক তেমনই এখনো অপেক্ষা করি। যদি আবারও ফিরে যেতে পারতাম আনন্দময় সেই খেলার মাঠে, নিশ্চিন্তপুরে।
হাটহাজারী, চট্টগ্রাম