একবার গ্রামের এক সাহসী যুবক সন্ধ্যার পর ওই বাড়িতে ঢুকে দেখে, ভূতেরা বসে সভা করছে। মানুষকে ভয় দেখানোর কলাকৌশল নির্ধারণবিষয়ক সেই সভায় উপস্থিত ভূতগুলো দেখতে নাকি ভীষণ ভয়ংকর। সেদিন সাহসী যুবকটি কোনোরকম নিজের প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। এর পর থেকে হোতাপাড়া গ্রামের কেউ আর সেই বাড়িতে ঢোকার সাহস করেনি। এখন ভূতের বাড়ি নামেই পোড়োবাড়িটির পরিচিতি।

সন্ধ্যার ঠিক পর পোড়োবাড়ির ভেতরে অদ্ভুত সব আওয়াজ হয়। দূর থেকে মনে হয় দল বেঁধে ভূতেরা হাসছে, নাচছে। আবার কখনো কখনো মনে হয় দল বেঁধে ভূতেরা কাঁদছে। আজ বিটুল সেই ভূতের বাড়ি যাচ্ছে। ১৪ বছর বয়সী হলেও সে ফেলুদার মতো সাহসী। রহস্যের জট খুলতে পারে। প্রয়োজনে রহস্যের মুখ উন্মোচন করতে সে নেমে যায় দুঃসাহসিক অভিযানে। তার অনেক দিনের ইচ্ছে, ভূতের সঙ্গে মুখোমুখি বসে গল্প করবে। সম্ভব হলে ভূতের সঙ্গে রাতের ডিনারও সারতে চায়।

পোড়োবাড়ির ভেতরে ঢুকতেই বিটুল বিদঘুটে একটা গন্ধ পেয়েছে। মনে হলো আচমকা একটা গন্ধ তার নাকে এসে প্রবল বেগে ধাক্কা দিয়ে গেল। চারদিকে পিনপতন নীরবতা, ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিটুল কাঁধের ব্যাগ থেকে টর্চ লাইট বের করে। আলো জ্বালাতেই মনে হয়, তার সামনে একটা কিছু নড়ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। পরক্ষণেই আবার মনে হলো, একটা কিছু তার সামনে দিয়ে উড়ে গেল, টর্চ মারতেই ছায়ার মতো হঠাৎ মিলিয়ে গেল। দক্ষিণ দিকের একটা কক্ষের দিকে ঢুকে গেছে মনে হয়। বিটুল ভাবল, বাদুড় হয়তো। এ রকম পরিত্যক্ত বাড়ি বাদুড়েরা দখলে নিতে বেশি সময় নেয় না। আবারও সে লাইট জ্বেলে দেখে, কোথাও কিছু নেই। আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল বিটুল। রুমের সামনে লেখা ‘নাচঘর’। দরজার ওপর ধুলার আস্তরণ। নাচঘরের ভেতর থেকে ভৌতিক একটা গন্ধ আসছে। বিষয়টা খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে বিটুল। মাকড়সার জাল ভেঙে সে দরজা খুলে নাচঘরে ঢুকল। ঘরের ভেতর কেউ নাচছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। নূপুরের ঝুমুর ঝুমুর আওয়াজ কানে আসছে। নাচঘরে দিনের বেলায় নাকি কবরের মতো অন্ধকার থাকে। বিটুল কান পেতে শোনার চেষ্টা করে, কোন দিক থেকে আসছে সেই আওয়াজ। না, ধরতে পারছে না।

এবার বিটুল কিছুটা ভড়কে যায়। দ্রুত সে তার ব্যাগ থেকে একটা শিশি বের করে। শিশিটা ডান হাতের মুঠোয় রাখে। বুকে সাহস নিয়ে আরও সামনে যেতে থাকে। সামনের দিকে আলো জ্বালাতেই অদ্ভুত এক হাসির শব্দ তার কানে ভেসে আসে। বিটুলের উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। মনে হচ্ছে, সঠিক জায়গায় চলে এসেছে। আজ সে ভূতের সাক্ষাৎ পাবেই। একটু পর টের পায়, সে সভাঘরে এসে পড়েছে। হু হু–হা হা করে একটা ভূত বিটুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। একচোখা ভূত। বিটুল দেখতে পাচ্ছে না। শুধু ভূতের ভৌতিক হাসিটা শুনতে পাচ্ছে। হাসি শুনে তার মনে হচ্ছে, ভূতটা এখানকার দলনেতা। ভূতটা গলা খেঁকিয়ে বলে ওঠে,
—কেরে তুই?
বিটুল অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কোনো জবাব না দিয়ে সে ভূতটাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। ভূতটা আবার প্রশ্ন করে,
—আমাকে খুঁজছিস?
—হ্যাঁ, তোর সাহস থাকলে আমার সামনে আয়।
হা হা–হু হু করে ভূতটা বলল,
—আমাকে দেখলে তুই তোর পরনের কাপড় নষ্ট করে ফেলবি। জীবনের মায়া থাকলে এখনই দ্রুত পালিয়ে যা।
—না, আমি যাব না। তোর সঙ্গে দেখা না করে আমি যাব না।
—আমাকে একবার দেখলে অজ্ঞান হয়ে তুই মাটিতে পড়ে যাবি। দাঁতের পাটিতে খিল লাগবে। তুই পালা...
—তুই আমার সামনে আয়। দেখি কে কাকে ভয় পায়?

আচমকা একচোখা একটা ভূত বিটুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওমা, কী ভয়ংকর দেখতে। ঠিক কপাল বরাবর একটা বিশাল চোখ। তবে নাক নেই, কান দুটি বেশ খাড়া, দাঁতগুলো করাতের মতো ধারালো। ভূতটা আলখাল্লা ধরনের কাপড় পরেছে। কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর ও কুৎসিত। দেখেই বিটুলের কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবু সে সাহস হারায় না। বিটুল তার হাতের শিশির মুখটা খুলে একচোখা ভূতের সামনে ধরতেই ভূতটা নেতিয়ে পড়ে। বিশেষ আতরের মিষ্টি ঘ্রাণে ম ম করছে পুরো পোড়োবাড়ি। সভাঘরে একে একে ঢুকছে তিনচোখা ভূত, মেছোভূত, গেছোভূত, ল্যাংড়া ভূত, পাঁচ হাতবিশিষ্ট ভূত। বিটুলের সামনে হাঁটু গেড়ে সব ভূত বসে আছে। জি জাহাঁপনা, জি জাহাঁপনা করছে। বিটুল তার গলায় একটু গাম্ভীর্য ভাব রেখে বলল,
—একচোখা ভূত, তোমার দলের একজনকে বলো আমার জন্য একটা সিংহাসনের ব্যবস্থা করতে।
—জি জাহাঁপনা।

একচোখা ভূতের হুকুমের আগেই তিনচোখা ভূত একটা সোনার সিংহাসন নিয়ে এল। হীরার দানার শৈল্পিক কাজ। বিটুল রাজার মতো সিংহাসনে বসেছে। সে ভূতদের মুখে গল্প শুনছে। কারও গল্প শুনে বিটুল হাসতে হাসতে প্রায় অজ্ঞান। আবার কারও গল্প শুনে বিটুলের চোখে জল চলে এসেছে। ভূতেরা দেখল বিটুল তাদের সুখের গল্প শুনে হাসছে। আবার তাদের কষ্টের কথা শুনে কাঁদছে। একচোখা ভূত ‘জয় জাহাঁপনার জয়’ বলে চিৎকার করে উঠল। অন্য ভূতেরা দলপতির সঙ্গে বলল, ‘জয় জাহাঁপনার জয়’। খুশিতে টইটম্বুর ভূতেরা বিটুলের জন্য মুহূর্তেই রাজকীয় খাবারদাবারের আয়োজন করে। ভূতদের সঙ্গে বসে সে তৃপ্তিসহ ডিনার করল। বিটুলের অনেক দিনের ইচ্ছে আজ পূরণ হয়েছে।

ফেরার সময় একচোখা ভূত তাকে এগিয়ে দিতে এল। পোড়োবাড়ির গেটে এসে দাঁড়াল। বিদায়ের বেলা একচোখা ভূত বিটুলকে আবার আসার নিমন্ত্রণ করল।

বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন