পিকাসোর কথা ভাবছি। আসলে ঠিক পিকাসো নয়, তাঁর ‘দ্য ওল্ড গিটারিস্ট’- এর কথা মনে পড়ছে। শিল্পীর চেয়ে তাঁর শিল্প বড় আবেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে আজকাল। মানুষ নতুন জিনিসপত্রে খুব একটা ভরসা করতে পারছে না বোধ হয়। পুরোনো প্রায় সবকিছুকে আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ব্যাপারটা খারাপ নয়। আসল সমস্যা হলো পুরোনো কাজগুলো যখন নতুন ছিল, তখন এগুলোকে ঠিক তেমন দৃষ্টিতে দেখা হতো, যেমনটা দেখা হয় সমসাময়িক কাজগুলোকে।
যাহোক, পিকাসোর কাছে ফিরে আসি। হাতে কফি নিয়ে দেখছি, কফির ধোঁয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘দ্য ওল্ড গিটারিস্ট’- এর ছায়া। ভ্রম ভেবে তুচ্ছ করতে চাই না। কিছু ভ্রম আনন্দ দেয়। মিথ্যা আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে। পিকাসো বার্সেলোনায় থাকাকালে মাস্টারপিসটি এঁকেছিলেন। পিকাসোর ব্লু পিরিয়ডের কাজ। আসলে এসব মূল কথা নয়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলছি নিজেকে প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতায়।
কফিশপে যে গানের টুংটাং ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তার সঙ্গে পরিচিত নই। গানের বিষয়ে ধারণা খুব কম। এ কারণে নিজেকে ব্যাকডেটেড মনে হয়। আশপাশের মানুষও ঠিক এমনটাই মনে করে। তবে নিজেকে এখন শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটের একজন দর্শনার্থী হিসেবে ভাবতে ভালো লাগছে।
তাদের দেখে বোঝা যায়, কিছু একটা নিয়ে দুজনই চিন্তিত। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে আছে, অধিক চিন্তিত মনে হচ্ছে। যদিও এই বয়সী মেয়েদের দেখলে সব সময় অধিক চিন্তিত মনে হয়। ছেলেটিকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কিছু।
বার্সেলোনার দুঃসহ স্মৃতিকাতর দিনগুলোতে পিকাসো নিজের বন্ধুর কথা ভেবে যেভাবে দিন পার করেছেন, সেই অভিজ্ঞতার অমর কাব্য হয়ে ফুটে আছে এই ওল্ড গিটারিস্ট, যে কিনা সব আশাবাদী মানুষের কাছে নিজের অস্তিত্ব এই বলে জানান দেয় যে একজন ছিল তাদেরই মতো, যার কাজ সব অবহেলা ও ব্যর্থতা ভরা দিনগুলোর হিসাব–নিকাশ জমা করা। থাক সে কথাও।
আচ্ছা, ‘রকস্টার’ মুভির রণবীর কাপুরকে নিয়ে কথা বললে কেমন হয়! না, সে কথাও থাক। চূড়ান্ত সফলতা পেয়ে যাওয়ার পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, সেটাই ভাবনার মূল বিষয়। বাথটাবে শুয়ে থেকে গিটার পুড়িয়ে ফেলার আইকনিক দৃশ্য আমাদের ‘নাদান পারিন্দে’ হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘আমাদের’ শব্দটা দিয়ে মূলত আমরা ‘আমি’ নামক শব্দ বা আবেগকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করি। সুন্দর অজুহাতে অন্যদের ভিড়ে নিজেদের বিসর্জন দিয়ে যাই অবিরত। গিটারিস্টবিষয়ক ভাবনায় এবার একটু বিরতি। ক্রিমসনে আগত সন্ধ্যা আমাকে মুগ্ধ করছে এখন। এক কোণে একটি যুগল বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, সমবয়সী। আচ্ছা, তাদের যে যুগল বলে ধরে নিলাম, এর কোনো যুক্তি আছে?
তাদের দেখে বোঝা যায়, কিছু একটা নিয়ে দুজনই চিন্তিত। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে আছে, অধিক চিন্তিত মনে হচ্ছে। যদিও এই বয়সী মেয়েদের দেখলে সব সময় অধিক চিন্তিত মনে হয়। ছেলেটিকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কিছু। এতটাই অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে যে দেখলে মনে হবে, সে এখন কোথায় আছে, কার সামনে আছে বা তার কী করা উচিত, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। এই দিকটাও বোধহয় এই বয়সী ছেলেদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। যুগল হলে অবধারিত ক্রিমসনের সন্ধ্যা তাদের মুগ্ধ করত। কিন্তু তাদের মধ্যে মুগ্ধতার লেশমাত্র নেই। আবার এটাও হতে পারে, তাদের উঠতি বয়সী আবেগ এখন শেষের দিকে। বাস্তবতার অজুহাতে ভুলে যেতে চাচ্ছে জাগতিক সব রোমান্টিক ব্যাপার।
কয়েক ওয়েটারকে দেখা যাচ্ছে। বিগলিত হাসি আর অসামান্য দক্ষতায় তারা পরখ করছে সব কাস্টমারকে। কে কত টাকার অর্ডার আর কত টিপস দিতে পারে, তার হিসাব হচ্ছে মনে মনে। আচ্ছা, এত কিছু যে ভাবছি, কারও কি কিছু এসে যায়? মনে হয় না। নিজের ভাবনা নিজের কাছে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে।
বার্সেলোনার কোনো এক কফিশপের দিকে তাকিয়ে থেকে আমাদের ওল্ড গিটারিস্ট কি চিন্তা করতে থাকে যে এখানে ঢুকতে পারলে ভালো লাগত? অপেরার সঙ্গে নিজের গিটারের অনুভূতি জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সে বোধহয় তৈরি করত জগতের সবচেয়ে ভালো অনুভূতির দৃশ্যায়ন। কিন্তু একটু পর নিজেকে খুব ছোট মনে হতে থাকে তার। নিজেকে মনে মনে শাসানি দিয়ে বলে, এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজের শিল্পকে বিক্রি করার কোনো মানে নেই।
এভাবেই চলতে থাকে ক্রিমসন কফিশপে ভাবনার মহাসড়কের গাড়িগুলো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, কফিশপগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে, মানুষ যাতে আবার মানুষকে ঠিকমতো দেখতে ও বুঝতে পারে। সবাই না, কেবল কয়েকজন মানুষ আবার নিজেদের পরখ করে দেখতে চায়। দাঁড়িপাল্লার বোঝা কাঁধে তুলে নিয়ে মাপজোখ করতে থাকে। একের পর এক কফির কাপ খালি হতে থাকে, কিন্তু তাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা হয় না। কেউ কেউ আবার বার্সেলোনার সেই ওল্ড গিটারিস্টের কথা ভুলে যায়। বার্সেলোনা বললেই তাদের সামনে ভেসে ওঠে একজনের নাম! যে কিনা সবুজ ঘাসের গালিচায় একে দেয় শিল্পের চিহ্ন। ‘লিটল বয় ফ্রম রোজারিও’র অদ্ভুত সুন্দর সুরের মূর্ছনায় ভেসে যেতে থাকে তাদের সব মায়াবি বেদনা। কিন্তু লিটল বয়কেও মাঝেমধ্যে সেই পুরোনো কিংবা নতুন না–পাওয়ার বৃত্তের ভেতর ঢুকে পড়তে হয়। সে তখন শূন্যতার মানে খুঁজতে থাকে। ‘দ্যা ওল্ড গিটারিস্ট’- এর মতো নিজেকে না পাওয়ার এবং নিজের হয়তো যা পাওয়ার কথা, তা না পাওয়ার কষ্টে ভেঙে চুরমার হতে হয়। ঈশ্বর প্রদত্ত সবকিছুর মধ্যেও যে অনেক কিছুই পাওয়া যায় না, এই বাস্তবতা মেনে নিতে হয়।
এবার বোধহয় এসব ভাবনার ইতি ঘটানো দরকার। বের হওয়ার সময় হয়েছে। বিল দেওয়ার সময় অদ্ভুত বিরক্তিসহকারে বেয়ারা দেখা শুরু করবে আমাকে। যদিও এ রকম দু–একজন উদ্ভ্রান্তের দেখা তারা হরহামেশাই পায়। বিল দিয়ে বের হয়ে এলাম। প্রকৃতি আনন্দ নিয়ে উষ্ণতার জানান দিচ্ছে। সন্ধ্যার শেষে রাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে গন্তব্য। একটি পথশিশু তাকিয়ে আছে ক্রিমসনের দিকে। পথশিশুটিকে পাশ কাটিয়ে আসার সময় মনে হলো, সব মাস্টারপিসের ভেতর লুকানো শিল্পের মাঝে যে পরিমাণ বিপন্নতা আর বিস্ময় ভরা বেদনা লুকিয়ে আছে, ঠিক সেই পরিমাণ আবেগ নিয়ে ক্রিমসনের পরিষ্কার কাচের দিকে তাকিয়ে আছে শিশুটি। কী দেখছে, জানি না। স্বচ্ছ কাচের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই তো দেখা যায় সবচেয়ে ভালো করে, তাই না?
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়