হারানো বিজ্ঞপ্তি

অলংকরণ: তুলি

সেদিন চোখে চোখ পড়তেই চোখের পর্দা টেনে নিয়েছিল রিতু। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলাম, ওর চোখের পাপড়ি তিরতির করে কাঁপছিল। বসন্ত বাতাসে যেন দুটি গোলাপকলি দুলছিল। মুখাবয়বে বিস্ময়মিশ্রিত খুশির অভিঘাত যেন আছড়ে পড়ছিল। এমন সুন্দর মুখ আর কখনো দেখিনি। মনে হতো, আমার কাছে যেন ওর অনেক আবদার। যেন ওর খুব আপন কেউ ছিলাম।

আমাদের বাবারা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। যদিও দুজনের আচার-আচরণে আকাশসম ব্যবধান। কোন ঘটনা যে তাঁদের বন্ধুত্বের শিকড় এমন গভীরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল; তার সংগত ব্যাখ্যা আজও আবিষ্কার করতে পারিনি। তাঁরা একই বছর বিয়ে করেন। বিয়ের পর বন্ধুত্বে যে ভাটা পড়ে; তাঁদের বেলা যেন তার উল্টো হয়েছে। আম্মুর কাছ থেকে শুনেছি, আমার সঙ্গে রিতুর বিয়ের ব্যাপারে তাঁরা আমাদের জন্মের পরেই নাকি কথা পাকাপাকি করে রেখেছিলেন।

আন্টিকে গিয়ে বললাম, ‘আঙ্কেল কই? রিতু কই? রিতু না গেট খুলে দিল।’ আন্টি আমার কথায় ধপাস করে পড়লেন। অমনি আঙ্কেলকে ফোন করলেন।

ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। কাউকে বিশেষ ভালো লাগার কোনো অনুভূতি তখনো আমার মধ্যে জন্মায়নি। তবু রিতুকে কেন যেন অনেক ভালো লাগত। মনে পড়ে, একসঙ্গে বসে রূপকথার গল্প পড়তাম। কত গল্প যে বানিয়ে বানিয়ে শোনাতাম ওকে! ও খুব খুশি আর বিস্মিত হতো।

আমরা ওদের বাসায় ভাড়া থাকতাম। নিচতলার এক ফ্ল্যাটে ওরা, আরেকটায় আমরা। একই সঙ্গে স্কুলে যেতাম। ক্লাসের ফার্স্টগার্ল হওয়ায় ও বসত একেবারে সামনের বেঞ্চে, আর আমি ছিলাম ব্যাকবেঞ্চার।
আমার আব্বু-আম্মু সেদিন কোথায় যেন গিয়েছিলেন। কোথায় গিয়েছিলেন আজ এত দিন পরে ঠিক মনে করতে পারছি না। আমাকে আন্টির জিম্মায় রেখে গিয়েছিলেন। আন্টি বিকেলবেলা বাসায় এলাকার ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতেন। সেই সুবাদে আমিও আন্টির কাছেই পড়তাম। সেদিন রিতু আমার দিকে কেমন যেন আড়চোখে তাকাচ্ছিল। ওর তাকানোটা সেদিন বড় অদ্ভুত আর মায়াবী ছিল। কে জানত, এই তাকানোটাই ছিল ওর শেষ তাকানো।

ঘড়ির কাঁটা তখন আটটা ছুঁই ছুঁই। পুরো শহর আলোয় ঝলমল করছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। আন্টি রান্নাঘরে ব্যস্ত। হয়তো শুনতে পাননি। ‘আব্বু এসেছে, আব্বু এসেছে’ বলতে বলতে গেট খুলতে দৌড় দিল রিতু। খানিক সময় পেরিয়ে গেলেও আঙ্কেলের কোনো সাড়া শুনতে পেলাম না। আন্টিকে গিয়ে বললাম, ‘আঙ্কেল কই? রিতু কই? রিতু না গেট খুলে দিল।’ আন্টি আমার কথায় ধপাস করে পড়লেন। অমনি আঙ্কেলকে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে আঙ্কেল বলে উঠলেন, ‘আজ অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। ফিরতে দেরি হবে একটু।’ আকাশ ভেঙে পড়ল মাথায়।
তাহলে রিতু যে গেট খুলে দিল। ওটা কে? আর রিতুই–বা কোথায় এখন?
চারদিকে হইচই শুরু হয়ে গেল। কোথাও রিতুকে পাওয়া যাচ্ছে না। আন্টি-আঙ্কেলের আহাজারি আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলল। মায়ের কোল থেকে সন্তান কেড়ে নেওয়ার মতো জঘন্য নৃশংসতায় রাতের আঁধার ভয়ংকর প্রকট হয়ে উঠল।

মাইকিং, পেপারিং, বিজ্ঞপ্তি—কিছুই বাদ রাখা হলো না। আশপাশের এলাকাগুলো তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো। পাওয়া গেল না রিতুকে। সবাইকে মুগ্ধ করা ছোট্ট একটা বালিকা সবার চোখে–মুখে যেন লটকিয়ে দিয়ে গেল, ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’। সুখী একটি পরিবার থেকে ওড়ে গেল সুখপাখি। সময়ে–সময়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে উড়ো খবর এল, রিতুর মতো কাউকে নাকি তারা দেখেছে। গিয়ে দেখা গেল, মেয়েগুলো রিতুর মতোই দেখতে; কিন্তু আমাদের সেই রিতু নয়।

শিক্ষার্থী, জামিয়া রাহমানিয়া আজিজিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা