প্রিয় বন্যা

প্রথমবারের মতো অনলাইনে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। এতে অসংখ্য চিঠি এসে জমা হয়। প্রতিযোগিতায় সমন্বয়ক ছিলেন ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান। বিচারকদের যাচাই বাছাইয়ের পর সেরা চিঠিগুলো প্রকাশ করা হলো।

প্রিয় বন্যা,

বৃষ্টিভেজা গোলাপের শুভেচ্ছা।
কেমন আছ খুব জানতে ইচ্ছা করে। কত দিন তোমাকে দেখি না।

মনে আছে, দক্ষিণা হাওয়ার দিনগুলোয় পাশাপাশি দুটি দালানে থাকতাম। ইশারায় চলত কথামালা। সন্ধ্যা হলে রেজার লাইটের আলো দিয়ে তোমাকে ডাকতাম। দখিনা খিড়কির পাশে খোলা চুলে দাঁড়িয়ে থাকতে। বিজলিবাতির ঝলকানিতে ঝলসে যেত পৃথিবী। লাল–নীল আলো–আঁধারিতে তুমি যেন আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টিকন্যা। তোমার চোখের অঞ্জন যেন রংধনু। তোমার লম্বা চুল হাঁটু ছুঁয়ে যেত। তোমার কালো ঘন কেশরাশি যেন গভীর অরণ্যের পাহাড়ি ঝরনাধারা। এই বুঝি বৃষ্টিফোঁটা আছড়ে পড়ল ঝরনাধারায়। গুনগুন করে তুমি গাইতে—
‘ঝড় পরেদ্দে লোছা লোছা উজান উডের কৈ, এন বরিষার কালে থাইক্কুম কারে লই আঁই থাইক্কুম কারে লই!’

দখিনা হাওয়ার ছাদে চুটিয়ে চলত লুকোচুরি গল্প, আনন্দ–বেদনার কাব্য রচনা। প্রথম দেখা ২২ জুলাই। গভীর অরণ্যে তোমার ভেজা পায়ে নূপুর পরিয়ে দেওয়া। তোমার কালো টিপ তর্জনী দিয়ে স্পর্শ করা। বৃষ্টির দিনে রিকশার হুড তুলে কত ঘুরেছি দুজনে শহরের অলিগলিতে।
ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম ছিল তোমার কাছে বেহেশতের খাবারের মতো। টংদোকানের কাক্কুর চা ছিল অমৃত, যেন কোনো হুর–পরি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে ঝড় তুলছে। খুব ইচ্ছা করছিল তোমার খোঁপায় কদম গুঁজে দিতে। দূরে সরিয়ে দিলে।

অতঃপর বাবার বদলি চট্টগ্রামে। হলুদ খামে কত চিঠি দিলাম। মাস যায়, বছর যায়, চিঠির উত্তর আসে না। ডাকপিয়ন নারায়ণ টুংটাং বেল বাজিয়ে যখন আসত, দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, কাকা, চিঠি আছে কি?

একদিন জানলাম, বিলাতে চলে গেলে তুমি। বৃষ্টিবেলায় আমি আজও বিকেলে মিছেমিছি বাড়ির ছাদে উঠে বৃষ্টি স্পর্শ করি। আধভেজা প্রহরে বৃষ্টিভেজা ছাদে তোমার পায়ের নূপুরের রিনিঝিনি আওয়াজ ভেসে আসে। বৃষ্টির পরে আকাশে রংধনু। ইশ্‌! তুমি পাশে থাকলে রংধনুর সাত রং দিয়ে রাঙিয়ে দিতাম। রাত্রিবেলা জোনাকি ধরে তোমার হাতে দিতাম। ফিসফিস করে বলতাম, তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি। বিশ্বাস করো, কখনো সাহস করে বলা হয়নি।

কুড়ি বছর পর পুরোনো ডায়েরির পাতা ওলটাতেই দেখি হলুদ খামের আঠাযুক্ত চিঠি। ডাকপিয়নকে দেওয়া হয়নি। পড়তে গিয়ে টুপটাপ চোখের জল গড়িয়ে পড়ল চিঠির ওপর। ভেজা চিঠির নিচে,
মিছেমিছি লিখতে লাগলাম—
পুনশ্চ: ভালোবাসাটা আসলে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার মতো। যেন বড় দায়, বড় ঝুঁকি, বড় কষ্ট। ভালোবাসার সাগরে ভীষণ ঝড় ওঠে। সে ঝড়ে হারিয়ে যায় কত নাবিক, কত পালতোলা নৌকা। তীর খুঁজে পায় না। তরি ডুবে যায়। সমুদ্রের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া পর্যটকের মতো তুমি একদিন হারিয়ে গিয়েছিলে জীবন থেকে।

ভালো থেকো, সুখে থেকো প্রেয়সী!

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা