একটা গভীর শূন্যতার অভিঘাতে এই চলচ্চিত্রের সূচনা। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু চর, চারদিকে শুধু বালু আর বালু, যেন শূন্য মরুভূমি। এই নির্জন প্রান্তরে মহাশূন্যের বুকে মূর্তাবয়ব এক বৃদ্ধ বসে আছেন। পরে জানা যায় তিনি হলেন হাসেন মোল্লার বাবা। বাস্তবে এখন তিনি মৃত। ক্রমে খোলসা, অদূরে রাখা একটা পুরোনো বায়োস্কোপ। একসময় তিনি এই বায়োস্কোপ দেখিয়ে সংসার চালাতেন। দৃশ্যের মধ্যে একটু দূরে হাসেন মোল্লাকেও দেখতে পাওয়া যায়। সে চাষাবাদ করে সংসার চালায়। মনের মধ্যে শেকড়ের সন্ধানে ভিন্ন ধারার সৃষ্টিশীলতা আবাদ করে চলে। কিন্তু বাস্তবের পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে ডানা মেলতে পারে না। বাবা মাঝেমধ্যেই তার স্বপ্নে এসে হানা দেয়। গল্পের টানে একটা দুঃস্বপ্ন এসেও হাসেনকে ঘিরে ধরে। হঠাৎ ধেয়ে আসা একদল গ্রামবাসী, তার কাছে লবণ চায়। সে এক সত্যাগ্রহী, দিতে অপারগ। এই গভীর শূন্যতাকে তীব্র ব্যাঞ্জনায় অর্থবহ করে ধীরে ধীরে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন পরিচালক রিয়াজুল রিজু।
এই বায়োস্কোপের মতো কত খেলা, কত ঐতিহ্য যে আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক মানচিত্র, জনজীবন থেকে হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যেতে বসেছে। সবই এখন কেবল সাদা পাতায় কালো হরফে ছাপা কিছু ইতিহাস বা কারও কারও স্মৃতির বেদনায় জাজ্বল্যমান। এখানেই সংস্কৃতিমনস্ক সৃষ্টিশীল মানুষের দায়বদ্ধতা, যা কিছু অচল, তাকে সচল করে তুলে ধরা। তাতেও যদি সংস্কৃতির সংবহনের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। জাতি নামের হাজার হাজার পাতার বিশাল বৃক্ষটি প্রাণ পায়।
হাসেনের লড়াই কিন্তু থামে না। মুক্তিযুদ্ধের সত্য কাহিনি বায়োস্কোপে প্রচারিত করে সে চরবাসীদের মধ্যে নবজাগরণ নিয়ে এসেছে। শুধু বাঙালি জাতির একটা হারানো খেলাকে সে ফিরিয়ে আনেনি, মুক্তিযুদ্ধও আজ দুয়ারে জাগ্রত।
এই হারানোর ঐতিহ্যের সন্ধানের সঙ্গে মাসুম রেজার অসাধারণ গল্পে এসে জুড়ে গিয়েছে বাঙালি জাতির লড়াই, ক্ষত-রক্তপাতের অন্য এক অবর্ণনীয় ইতিহাস। শিরদাঁড়া শক্ত করে বাঁচার, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অন্য এক মহাকালজয়ী ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ। সব মিলিয়ে স্বল্প পরিসরে একটি জাতির জনজাগরণের মহাকাব্যে পরিণত হয় রিজুর ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’।
বাংলা ভাষা নামের দেশটা যে কতটা সুন্দর ক্যামেরায় ধরেছেন মেহেদী রনি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সুর দিয়ে বিশ্বপ্রাণের হৃদয় ছোঁয়া যায়, প্রমাণ করেছেন আমিরুল ইসলাম, অয়ন চৌধুরী, এস আই টুটুলের মতো গীতিকার, সুরকারেরা। বাংলাদেশের একশ্রেণির বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র দেখলে বোঝা যায়, এর অনেক দৃশ্য প্রতিবেশী ভারতের হিন্দি সিনেমার দ্বারা প্রভাবিত। আসলে পরিচালকরা ছোটবেলা এত বেশি এই চলচ্চিত্রগুলোতে ডুবে থেকেছেন যে চেতনে–অবচেতনে নিজের কাজের মধ্যেও তার প্রভাব এসে পড়ছে। সেদিক থেকে রিজুর ছবি একেবারে খাঁটি বাংলার মাটির গন্ধ মাখা। মৌলিক আঞ্চলিক বাঙালি ঘরানার। প্রমত্ত নদীর বুকে একটা বড় নৌকাকে নবদম্পতির প্রেম বিলাসের জন্য এত সুন্দর সাজিয়ে তোলা, নিচে খুপরি, ওপরে আবার দোলনা রাখা ছবির সেট নির্মাণেও প্রশংসার দাবী রাখেন এই বাঙালি শিল্পীরা।
চরের মানুষের জীবনযাপন, লড়াই সংগ্রাম, নিম্নবর্গের মানুষের ওপর জমিদারের অত্যাচার, অত্যাচারের নির্মম–নির্দয় ইতিহাসও একটি জাতিসত্তার টিকে থাকার বৃত্তান্তকে তুলে ধরে। মদ, নারী, ভোগবিলাসে মেতে থাকা বর্তমান জমিদার জীবন সরকারের নামে এই চরের নাম ‘চর ভাগিনা’। তার মামা সিকান্দার ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পাকিস্তানপন্থী রাজাকার। মানুষের ওপরে নির্মম অত্যাচার করে, ঘরে ঘরে নারী নির্যাতন করে পাকিস্তানি দোসরদের সাহায্য নিয়ে সে ফুলেফেঁপে কলাগাছ হয়েছে। এই চরটাও তার শাসনের দখল করা চর। সেই অত্যাচারী মামার রক্ত আজ ভাগ্নের শরীরে।
ইউসুফ নামের এক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের সময় নিজের অঞ্চলের লোক বলে সিকান্দারকে দয়া করে প্রাণভিক্ষা দিয়েছিল। অথচ বেঈমান নরাধম সিকান্দার বাড়িতে খেতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ইউসুফকে পাকিস্তানিদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে হত্যা করে। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া সেই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ হলো হাসেন মোল্লার চাচা। হাসেন বাবার ফেলে যাওয়া পেশার টানে আজ আবার সবাইকে বায়োস্কোপ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা চাচা আর রাজাকার সিকান্দারের সেই কাহিনিকে বায়োস্কোপের বিষয় করেছে। গ্রামের মাদ্রাসায় পড়া এক তরুণ ইনসান কাহিনির ছবিগুলো এঁকে দিয়েছে। মাদ্রাসায় পড়া ছেলেরাও যে সংস্কৃতিমনস্ক হতে পারে, রবীন্দ্র–নজরুল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকতে পারে, প্রকৃত ইসলাম ধর্ম শিক্ষার সঙ্গে এসবের কোনো বিরোধ নেই; পরিচালক সেই বিষয়টিতেও আলোকপাত করলেন।
কিন্তু রাজাকার মামার কথাগুলো সবার মধ্যে প্রচারিত হলে, ভাগ্নে জীবন সরকারের পারিবারিক ক্ষমতা প্রতিপত্তির রাজনীতিতে ফাটল ধরবে; তাই সে হাসেনের খেলা দেখানো চিরতরে বন্ধ করে দিতে চায়। হাসেন কিছুতেই চাচার কথা বলা থামাবে না, বাবার খেলা দেখানো থামাবে না। শুরু হয় চরের মানুষকে নিয়ে হাসেনের নতুন এক মুক্তিযুদ্ধ। জীবন ইনসানকে হত্যা করে। গ্রামে লবণ বিক্রি বন্ধ করে দেয়। গ্রামবাসীরা লবণহীন কিছু খেতে না পেরে হাসেনকে জমিদারের সঙ্গে আপোষে সব মিটিয়ে নিতে বলে। কিন্তু হাসেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখেনি।
জমিদার পতিতাপল্লি থেকে যে পানাইকে বিয়ে করে এনেছিল, সেই সুন্দরী পানাই আজ গ্রামবাসীদের দুর্দশায় আড়াল থেকে পাশে এসে দাঁড়ায়। নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে গিয়ে পাহারাদারকে রাতের অন্ধকারে নিজের শরীর ভোগের ফাঁদে ফেলে গুদাম থেকে গ্রামবাসীর ঘরে লবণ পাঠায়। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে এভাবেও যে নারীরা দেশের জন্য লড়াই করেছিল। বিনিময়ে সব জানতে পেরে জমিদার জীবন সরকার তাকে নিজের জীবন এবং বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
হাসেনের লড়াই কিন্তু থামে না। মুক্তিযুদ্ধের সত্য কাহিনি বায়োস্কোপে প্রচারিত করে সে চরবাসীদের মধ্যে নবজাগরণ নিয়ে এসেছে। শুধু বাঙালি জাতির একটা হারানো খেলাকে সে ফিরিয়ে আনেনি, মুক্তিযুদ্ধও আজ দুয়ারে জাগ্রত। আজকের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে রাজাকার বংশের নতুন রাজাকারকে মাথা নত করতেই হবে। জীবনের দেহরক্ষীই জীবনের প্রকৃত সৎকার করে ছাড়বে।
জীবন চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম খুব ভালো অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশের নামকরা এই ভিলেনকে পরিচালক মধ্যবয়সী একজন প্রেমিকও বানিয়ে তুলেছেন এই চলচ্চিত্রে। হাসেন মোল্লা চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদ তানভীর মোকাম্মেলের ‘জীবন ঢুলী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বিশ্ব বাঙালির নজর কেড়েছিলেন। এই চলচ্চিত্রেও নিজেকে শতভাগ মেলে ধরেছেন। পানাই সানজিদা তন্ময় দেখতে যেমন সুন্দর, অভিনয় দক্ষতায় বেশ সুন্দরী হয়ে উঠেছেন। অভিনয়ে চরের বায়োস্কোপওয়ালার যোগ্য বউ হাফসা মৌটুসী। ‘প্রেমের বাজারে তুমি সোনায় সোয়াগী..’ নদীতে বড় নৌকায় ভেসে গানটির চিত্রায়ণ অত্যন্ত সুন্দর। আমিরুল ইসলামের কথা ও সুরে গানটি করেছেন সাইম বিপ্লব। আমিরুল ইসলামের কথা সুর এবং কণ্ঠে ‘তোমার মুখের ছবিখানা ভাদ্রমাসের জ্যোৎস্না’ গানটিও ভালো লাগে। চর ভাগিনায় নতুন বউকে এই গান দিয়ে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে। চরের মানুষের জীবন নিয়ে এস আই টুটুলের গানের কথাগুলোও দৃশ্যে সুন্দর ফুটে উঠেছে। মাসুম মহিউদ্দিনের ‘নীল আকাশ, নীল পাখি’ গানটি কষ্ট দেয়।
রিয়াজুল রিজু প্রথম চলচ্চিত্রেই নান্দনিক কৃষ্টিতে গোটা একটা জাতি সত্তার জাগরণ ঘটিয়ে দিলেন। শত প্রতিকূলতায় বাঙালি হারতে শেখেনি। ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ চলছে, চলবে।
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত