বৃষ্টি নামছে। আবার সেই চিরচেনা সুরে, সেই অনন্ত গল্পে। আকাশের ধূসর চাদরে মুড়ে আছে এই শহর, এই পৃথিবী, এই আমি। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি কেমন করে জল ঝরে পড়ে পাতার ওপর, কেমন করে মাটিতে মিশে যায় আকাশের কান্না।
তুমি আর নেই। এই সত্যটা যেন একটা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে আমার বুকের ওপর। তুমি আর নেই—এই কথাটা বলতে পারি, কিন্তু মানতে পারি না। তুমি কেমন করে নেই? কেমন করে হয় যে একদিন ছিলে, আজ নেই? কেমন করে হয় যে একটা মানুষ হাওয়ায় মিশে যায়, মাটিতে মিশে যায়, আর আমি থেকে যাই এই শূন্যতার সঙ্গে!
বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে মনে পড়ে সেই দিনের কথা। কোনো এক আষাঢ়ের সন্ধ্যায় আমরা হেঁটেছিলাম রমনা পার্কের পথে। তুমি বলেছিলে, ‘বৃষ্টি আসছে। দেখো, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো।’ আমি তাকিয়েছিলাম। ঘন কালো মেঘ জমে আছে, যেন কোনো কবির অমীমাংসিত স্বপ্ন। তুমি হাসতে হাসতে বলেছিলে, ‘আমার বৃষ্টি ভালো লাগে। তুমি জানো, বৃষ্টি মানে নতুন শুরু।’
বৃষ্টি আরও জোরে নামছে। আকাশ যেন কাঁদছে। আমিও কাঁদছি। চোখের জল আর আকাশের জল একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
নতুন শুরু। আজ বৃষ্টি নামছে, কিন্তু আমার কোনো শুরু নেই। আছে শুধু শেষ। আছে শুধু মৃত্যুর মতো এক নিস্তব্ধতা।
জানি না, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি জানালার পাশে। সময় এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘড়ির কাঁটা যেন হৃদয়ের স্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। ধীর, ধীর, ধীর। কখনো কখনো থেমে যায়। যেমন তুমি থেমে গিয়েছিলে। তুমি থেমে গিয়েছিলে সেই দিন। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে, তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে। তোমার চোখে কোনো ভয় ছিল না। ছিল শুধু এক অদ্ভুত শান্তি। তুমি বলেছিলে, ‘আমি চলে যাব। কিন্তু তুমি আমায় মনে রাখবে, তাই না?’
আমি কিছু বলতে পারিনি। কী বলব? যে আমি তোমাকে কখনো ভুলতে পারব না? যে তুমি আমার শ্বাসের সঙ্গে মিশে আছ? যে তুমি আমার স্বপ্নের সঙ্গে মিশে আছ? যে তুমি আমার বৃষ্টির সঙ্গে মিশে আছ?
কিন্তু সব কথা তো আর বলা হয় না। অনেক কথা থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে, অনুচ্চারিত, অব্যক্ত।
বৃষ্টি আরও জোরে নামছে। আকাশ যেন কাঁদছে। আমিও কাঁদছি। চোখের জল আর আকাশের জল একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি না কোনটা আমার, কোনটা আকাশের।
এই শহরে আমি একা। এই পৃথিবীতে একা। তুমি গেছ, আর আমি রয়ে গেছি। এই থেকে যাওয়াটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন। মৃত্যু একটা মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু বেঁচে থাকা—এই নিঃসঙ্গতার সঙ্গে বেঁচে থাকা, প্রতিটি মুহূর্তে যন্ত্রণা।
আমি বের হই। বৃষ্টির মধ্যে বের হই। জল গায়ে লাগে, চুলে লাগে, মুখে লাগে। আমি হাঁটি। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটি। পথ চিনি না, গন্তব্য জানি না। শুধু হাঁটি। যেন হাঁটতে হাঁটতে তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব।
ঢাকার রাস্তায় আমি একা। মানুষ আছে চারপাশে, কিন্তু আমি একা। রিকশাওয়ালা আছে, ছাতাওয়ালা আছে, দোকানদার আছে। কিন্তু আমি একা। তুমি নেই বলে আমি একা। শাহবাগের মোড়ে এসে থামি। এখানে আমরা প্রথম দেখা করেছিলাম। তুমি বই কিনছিলে, আমি বই কিনছিলাম। তোমার হাতে ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’। আমার হাতে ছিল জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে। বলেছিলে, ‘আপনিও কবিতা পড়েন?’
আমি বলেছিলাম, ‘পড়ি। কবিতা ছাড়া বাঁচা যায় না।’
তুমি বলেছিলে, ‘তাহলে আমরা একই রকম।’
একই রকম! হ্যাঁ, আমরা একই রকম ছিলাম। একই স্বপ্ন, একই ভালোবাসা, একই দুঃখ। কিন্তু এখন আমি একা।
বৃষ্টি থামছে না। আমিও থামছি না। হাঁটতে থাকি। রমনা পার্ক, শিশু একাডেমি, বায়তুল মোকাররম—সব জায়গায় তোমার স্মৃতি। সব জায়গায় আমাদের স্মৃতি। সব জায়গায় আমাদের কথা, আমাদের হাসি, আমাদের ভালোবাসা।
ভালোবাসা। এই শব্দটা আজ আর বলতে পারি না। এই শব্দটা গলায় আটকে যায়, হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধে। তুমি বলেছিলে, ‘ভালোবাসা মানে একসঙ্গে থাকা নয়। ভালোবাসা মানে একে অপরের মধ্যে থাকা।’
তখন বুঝিনি। এখন বুঝি। তুমি আমার মধ্যে আছ, আমার শ্বাসের সঙ্গে আছ, আমার স্বপ্নের সঙ্গে আছ।
কিন্তু এই থাকাটাও কি যথেষ্ট? এই থাকাটা কি আমার একাকিত্ব ভাঙতে পারে? এই থাকাটা কি আমার শূন্যতা পূরণ করতে পারে? জানি না। কিছুই জানি না।
রাত নামছে। বৃষ্টি পড়ছে। আমি ঘরে ফিরি। কিন্তু ঘর আর ঘর নেই। ঘর হয়ে গেছে একটা খাঁচা। একটা শূন্যতার খাঁচা।
আমি বসি তোমার প্রিয় চেয়ারে। সেই চেয়ার যেখানে তুমি বসে কবিতা পড়তে। তুমি আমায় শোনাতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, জীবনানন্দের কবিতা, হেলাল হাফিজের কবিতা। তোমার কণ্ঠস্বর কানে বাজে—
‘এই সেই আমি, যেই আমি, যাহা আমি, যাহা আমি ছিলাম—সবই তোমার মধ্যে হারিয়ে গেছে...’।
হারিয়ে গেছে। হ্যাঁ, আমি হারিয়ে গেছি। তুমি নেই বলে আমি হারিয়ে গেছি। আমি খুঁজে পাচ্ছি না আমাকে। আমি খুঁজে পাচ্ছি না আমার অস্তিত্ব।
তোমার ডায়েরি খুলি। তোমার শেষ লেখা—
‘আমি চলে যাব। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যেতে চাই। আমি চাই না তুমি আমার জন্য কাঁদো। আমি চাই তুমি আমার জন্য হাসো। আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো। আমি চাই তুমি ভালোবাসো। আমার ভালোবাসা তোমার মধ্যে বেঁচে থাকুক। আমার স্বপ্ন তোমার মধ্যে বেঁচে থাকুক।’
আমি পড়ি আর কাঁদি। তোমার কথা শুনে কাঁদি। তোমার কথা না শুনে কাঁদি।
বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু আমার কান্না থামছে না। থামবেও না। এই কান্নাই জীবন। এই কান্নাই আমার পরিচয়।
আমি উঠে দাঁড়াই। জানালার পাশে যাই। বাইরে দেখি। রাস্তায় জল জমে আছে। আকাশে তারা উঠেছে। চাঁদ উঠেছে। কিন্তু আমার মনে তারা নেই। মনে চাঁদ নেই। আছে শুধু অন্ধকার। তুমি কোথায় এখন? তুমি কি আমায় দেখতে পারো? তুমি কি আমার কান্না শুনতে পারো? তুমি কি আমার একাকিত্ব অনুভব করতে পারো?
জানি না। কিছুই জানি না। শুধু জানি তুমি আর নেই। শুধু জানি আমি একা। এই একাকিত্ব নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। এই শূন্যতা নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। এই স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।
কিন্তু আমি কি পারব? পারব কি তোমার কথা মনে রেখে বেঁচে থাকতে? পারব কি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে? পারব কি তোমার ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতে? জানি না। কিছুই জানি না। কিন্তু আমি চেষ্টা করব। তোমার জন্য চেষ্টা করব। তোমার স্মৃতির জন্য চেষ্টা করব। তোমার ভালোবাসার জন্য চেষ্টা করব। চেষ্টা করব বেঁচে থাকতে। এই নিঃসঙ্গতার সঙ্গে, এই শূন্যতার সঙ্গে, এই স্মৃতির সঙ্গে। চেষ্টা করব তোমায় ভুলে না যেতে। চেষ্টা করব তোমায় মনে রাখতে। চেষ্টা করব তোমায় ভালোবাসতে। কারণ, তুমি বলেছিলে, ‘ভালোবাসা মানে একসঙ্গে থাকা নয়। ভালোবাসা মানে একে অপরের মধ্যে থাকা।’
তুমি আমার মধ্যে আছ। তুমি আমার প্রতিটি শ্বাসে আছ, প্রতিটি স্বপ্নে আছ, প্রতিটি স্মৃতিতে আছ।
আমি জানালা খুলে দিই। রাতের হাওয়া ঢোকে। সেই হাওয়ার সঙ্গে আসে তোমার গন্ধ। তোমার স্পর্শ। তোমার উপস্থিতি। আমি চোখ বন্ধ করি। অনুভব করি তুমি এসেছ। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছ। আমার হাত ধরেছ। কানে ফিসফিস করে বলছ, ‘আমি আছি। সব সময় আছি।’
আমি চোখ খুলি। তুমি নেই। কিন্তু তোমার উপস্থিতি আছে। তোমার ভালোবাসা আছে, স্মৃতি আছে। বুঝতে পারি, মৃত্যু শেষ নয়। মৃত্যু শুধু একটা রূপান্তর। তুমি আমার কাছ থেকে চলে যাওনি। তুমি আমার মধ্যে চলে এসেছ, আমার অংশ হয়ে গেছ, আমার পরিচয় হয়ে গেছ।
আমি আবার বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকব। কারণ, বৃষ্টির মধ্যে তুমি আসো, আমার সঙ্গে কথা বলো। আমি ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকব। কারণ, ভালোবাসা কখনো মরে না। কখনো শেষ হয় না। ভালোবাসা অনন্ত, আর তুমি অমর।
আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। বৃষ্টির স্মৃতি নিয়ে। হৃদয়ের শূন্যতা নিয়ে। ভালোবাসার অমরত্ব নিয়ে।
শিক্ষার্থী, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিলেট।