জানালার পর্দা সরিয়ে ঘুমন্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ ভিজে ওঠে রোদেলার। কত সুন্দর মেয়ের চোখজোড়া। নিজেকে সামলে ডাকেন, ‘মেঘলা, মেঘলা, ওঠ মামণি, ওঠ—দেরি হয়ে যাচ্ছে’।
আড়মোড়া চোখে ঘুম ভেঙে উঠে বসে মেঘলা, তাকায় ক্যালেন্ডারে গোল দাগ দেওয়া ২১ তারিখের দিকে। প্রতিবছর সে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। ফেব্রুয়ারি এলেই চলে তার কতশত পরিকল্পনা, সব লিখে রাখে প্রিয় নীল ডায়েরিতে। মায়ের কাছে ইশারায় চলে শত আবদার।
মেঘলা কথা বলতে পারে না। জন্ম থেকেই তার কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই। কিন্তু তার চোখে আছে হাজার শব্দের ঢেউ, আর হৃদয়ে আছে ভাষার জন্য গভীর মায়া।
কথা বলতে না পারলেও তার শ্রবণশক্তি বেশ ভালো। স্কুলের শিক্ষক যখন বলছিলেন, ১৯৫২ সালের সেই ফেব্রুয়ারির কথা, ভাষা আন্দোলন, কীভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তরুণেরা বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। ড্রয়িং খাতায় সে আঁকে সালাম, বরকত, রফিকদের ভাষার প্রতি প্রেম।
প্রতিবছর একুশের সকালে সাদাকালো জামা পরে, মায়ের হাত ধরে এক হাতে ফুল নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে যায় তারা। শহীদ মিনারের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার বুক ধুকপুক করে। চারপাশে মানুষের কণ্ঠে ভেসে আসে, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’ মেঘলা গান গাইতে পারে না, তার চোখ আবারও ভিজে ওঠে।
শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে ফুলগুলো রেখে দেয়। সেখানে ছড়িয়ে থাকা শত শত ফুলের নীরবতা যেন মেঘলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। বাড়ি ফিরে মেঘলা তার রংতুলি হাতে নেয়। ক্যানভাসে আঁকে এক বিশাল আকাশ, মাঝখানে শহীদ মিনার, সামনে ছোট্ট একটি মেয়ে—দুহাতে ফুল। মেয়েটির মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অক্ষর অ, আ, ক, খ।
মেঘলার আঁকা ছবিটি দেখে মা চোখ মোছেন। তিনি জানেন, তার মেয়ের কণ্ঠ না থাকলেও ভাষার প্রতি তার ভালোবাসা কারও চেয়ে কম নয়। মেঘলা ছবি আঁকছে আর শব্দ বের হচ্ছে আ আ আ আ। মা জানেন না, এখন মেঘলা মনে মনে গাইছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি....’
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা