জীবন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

রাত ১২টা বেজে ৩৫ মিনিট। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এক বিশাল ও সুপ্রসিদ্ধ হাসপাতালের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। কাছেই এক প্রিয়জন মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কক্ষের ভেতর। হয়তো শেষ চিৎকারে জানিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে; শুনে রাখো সবাই—আমার এই জীবন বড় শান্তিময় ও আরামদায়ক ছিল না।
বাইরে দাঁড়িয়ে সেই করুণ কণ্ঠে গোঙানির আওয়াজ শুনছি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। আর আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছি; অথচ আমার কিছুই করার নেই।

বাইরে হালকা মৃদুমন্দ বাতাসে নড়ছে হাসপাতালের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেলগাছের পাতাগুলো। একটু দূরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অন্য সব গাছের পাতাও সংঘবদ্ধ হয়ে তাল মেলাচ্ছে। চাঁদটা কোথায় গেল কে জানে। দূর আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলছে কয়েকটি নিঃসঙ্গ নক্ষত্র।

মনটা ভীষণ খারাপ। কিছুই ভালো লাগছে না। ভগ্নমনোরথে নিচে এসে পায়চারি করতে আরম্ভ করলাম। মাঠে কিংবা সড়কে কোথাও লোকজন নেই। এত রাতে থাকার কথাও নয়। সামনের রাস্তা দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলছে যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাস ও মালবাহী ট্রাক। হাঁটতে হাঁটতে মেইন গেটের এদিকটায় এসে দেখি, একটা দামি প্রাইভেট কার ও আধা পুরোনো একটি মোটরসাইকেল। উভয়ের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে দুজন পুরুষ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অধীর আগ্রহে তারা কারও জন্য অপেক্ষা করছে। খানিকটা মায়াও হয়। সামনে দুই কদম এগিয়ে আসতেই দেখলাম, হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছে সাদা অ্যাপ্রন পরিহিতা দুজন নারী। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একজন ডাক্তার আর অন্যজন নার্স। হয়তো ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরবে। তাদের মধ্য থেকে প্রথমজন এসে গাড়িতে বসল। আর ড্রাইভিং সিটে বসল দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ লোকটা।

হালকা কিছু কথোপকথনও হয় অপেক্ষারত লোকটার সঙ্গে। বুঝলাম, তারা দুজন স্বামী-স্ত্রী। গাড়ি স্টার্ট করে তারা তাদের মতো করে চলে গেল।
দ্বিতীয়জনকে আসতে দেখে মোটরসাইকেলে উঠে স্টার্ট দিল অন্য লোকটি। পেছনে বসতেই তারাও ছুট দিল অন্য দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে। এটাই তো আমাদের জীবন। কেউ হাসবে, কেউ কাঁদবে। কেউ জন্মগ্রহণ করবে আবার কেউবা চলে যাবে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে। পৃথিবীতে কত হাজার হাজার মানুষ। প্রতিনিয়ত-ই তো কেউ না কেউ জন্মগ্রহণ করছে আবার মৃত্যুবরণও করছে।